ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত নির্মিত ২৩৬ কিলোমিটার নতুন রেলপথে উদ্বেগজনক হারে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও অবকাঠামো চুরির ঘটনা ঘটছে। প্রায় ৩৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মেগা প্রকল্পে জনবল সংকট, সীমিত নজরদারি এবং দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র রেলের বিভিন্ন মূল্যবান সরঞ্জাম খুলে নিয়ে যাচ্ছে। এতে যেমন রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি ট্রেন পরিচালনার নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন রেলপথ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট (সিএসসি) বাংলাদেশ রেলওয়েকে পাঠানো এক চিঠিতে নিয়মিত চুরি ও নাশকতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
চুরি হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে রেললাইনের স্ক্রু স্পাইক, ফিশ বোল্ট, রেল ক্লিপ, ফিশ প্লেট, গেজ প্লেট, টার্নআউট বোল্ট, বাফারের বিভিন্ন অংশসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। এছাড়া সেতু, কালভার্ট ও আন্ডারপাস থেকে স্টিল গ্রেটিং, হ্যান্ডরেল, রেলিং, জয়েন্ট প্লেট ও ট্র্যানজিশন পাইপও চুরি হয়েছে।
স্টেশন ও ভবন থেকেও পাম্পের মোটর, পানির মিটার, দরজার লকিং সিস্টেম, জানালার কাচ, গ্রিল, ম্যানহোল কভার, টয়লেটের স্যানিটারি ফিটিংস, পানির কল ও ফ্যান চুরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক কেবল, ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ড, সাবমারসিবল পাম্প এবং সিগন্যালিং ব্যবস্থার ট্র্যাক ট্রান্সফরমার, অ্যাক্সেল কাউন্টার, পয়েন্ট মেশিন ও পয়েন্ট মোটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও চোরদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
রেল কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সিগন্যাল সরঞ্জাম ও কেবল চুরির কারণে আধুনিক কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অনেক জায়গায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
মাদারীপুরের শিবচর স্টেশনে চলতি বছরের মার্চ, জুনের ৯ ও ১৯ তারিখে একাধিকবার ট্র্যাক পট চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্লক ব্যবস্থা অচল হয়ে ট্রেন পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে রেলকর্মীদের ঝুঁকি নিয়ে ‘লুক স্টিক’ ব্যবহার করে ম্যানুয়ালি লাইন ক্লিয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
শিবচর ও পদ্মা রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘন ঘন যন্ত্রাংশ চুরির কারণে ট্রেন সময়মতো চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপত্তা জোরদার এবং রেলপথে স্থায়ী নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিএসসি তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছে, প্রকল্প হস্তান্তরের পর সম্পদের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশ রেলওয়ের। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবে চুরি-নাশকতা ঠেকানো যাচ্ছে না। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কার কথাও সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, সরঞ্জাম চুরির বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে। সীমিত জনবল দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং জনবল বাড়ানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৭টি নতুন স্টেশন নির্মাণ ও তিনটি স্টেশন সংস্কার করা হলেও বর্তমানে মাত্র ১২টি স্টেশনে ট্রেন থামে। অধিকাংশ স্টেশনে স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকায় নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
রেল সূত্র জানায়, প্রকল্প পরিচালনার জন্য প্রস্তাবিত ১ হাজার ৫৭৪ জন নতুন জনবল নিয়োগের অনুমোদন এখনো মেলেনি। ফলে অধিকাংশ স্টেশন পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমানে ঢাকা-যশোর রুটে মাত্র ছয়টি ট্রেন চলাচল করছে, যদিও এই রেলপথে প্রতিদিন প্রায় ৪৮টি যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে। জনবল, কোচ ও ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না; নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে এমন ব্যয়বহুল প্রকল্পের সুফলও পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়।