একসময় মনে হচ্ছিল, সবকিছু শেষ। লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ যাত্রা বুঝি থেমে যাচ্ছে শেষ ষোলোতেই। স্কোরবোর্ডে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে মিশর, তার ওপর মেসির পেনাল্টি মিস—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার সামনে তখন অন্ধকার ভবিষ্যৎ।কিন্তু যাদের দলে লিওনেল মেসি আছেন, তাদের গল্প শেষ বাঁশি বাজার আগে শেষ হয় না।ম্যাচের শেষ ১৩ মিনিটে যেন বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। প্রথমে ব্যবধান কমানোর পথ তৈরি করেন মেসি। এরপর নিজেই সমতার গোল করেন। আর ইনজুরি সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলে ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য এক জয় তুলে নেয় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই নাটকীয় জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড।শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি মেসি। চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। যেন এই জয় শুধু একটি ম্যাচ নয়, বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক।কেপ ভার্দের বিপক্ষে কঠিন ম্যাচের পর কোচ লিওনেল স্কালোনি একাদশে পরিবর্তন আনেন। মেদিনা, থিয়াগো আলমাদা ও লাউতারো মার্টিনেজের জায়গায় নেন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও জুলিয়ান আলভারেজকে। উদ্দেশ্য ছিল মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা করা।তবে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল মিশর। ম্যাচের ১৪ মিনিটে কর্নার থেকে ইয়াসির ইব্রাহিমের দুর্দান্ত হেডে এগিয়ে যায় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে হারিয়ে তিনি বল জড়িয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজের জালে।চার মিনিট পর সমতায় ফেরার সোনালি সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। তাগলিয়াফিকোকে বক্সের ভেতরে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় দলটি। কিন্তু স্পটকিক থেকে লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি মেসি। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার চতুর্থ পেনাল্টি মিস এবং চলতি আসরে দ্বিতীয়। ফলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি মিস করা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড যোগ হয় তার নামের পাশে।তবু হাল ছাড়েনি আর্জেন্টিনা। বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে একের পর এক আক্রমণ চালায়। কিন্তু মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের অসাধারণ সেভে প্রথমার্ধে আর গোল পাওয়া হয়নি।দ্বিতীয়ার্ধে নাটক আরও জমে ওঠে। ৫৮ মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে মোস্তফা জিকো বল জালে জড়ালেও ভিএআর পর্যালোচনায় বিল্ড-আপে ফাউলের কারণে গোল বাতিল হয়। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি মিশরকে। ৬৬ মিনিটে হাসানের দারুণ একক প্রচেষ্টার পর জিকো গোল করে ব্যবধান ২-০ করেন। তখনই মনে হচ্ছিল, ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে যাচ্ছে মিশর।কিন্তু এরপর শুরু হয় মেসির গল্প।শেষ দিকে তার নিখুঁত ক্রস থেকে রোমেরো হেডে ব্যবধান কমান। কয়েক মিনিট পর নিজের দুর্দান্ত দক্ষতায় ডি-বক্সে বল পেয়ে সমতার গোল করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এটি ছিল চলতি আসরে তার অষ্টম এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ২১তম গোল।নাটকের শেষ দৃশ্যটি আসে যোগ করা সময়ে। মিশরের আক্রমণ ভেস্তে গেলে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা। লাউতারো মার্টিনেজের নিখুঁত ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজ বল জালে জড়িয়ে দেন। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনা শিবির। গোল উদযাপনের সময় জার্সিতে থাকা বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ব্যাজের দিকে আঙুল তুলে ধরেন এনজো যেন জানিয়ে দেন, শিরোপা রক্ষার লড়াই এখনো শেষ হয়নি।মাত্র ১৩ মিনিটে তিন গোল। এক অসম্ভব প্রত্যাবর্তন। এক ম্যাচে হতাশা, নাটক, আবেগ আর বীরত্বের সব রঙ একসঙ্গে মিশে তৈরি হলো বিশ্বকাপের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও একজনই লিওনেল মেসি।