নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ, রূপসা নদীঘেঁষা খুলনার খালিশপুর এলাকা। বিআইডিসি রোডের ধুলোবালি আর গোলপাতা ঘেরা মেঠো পথ ধরে তখন প্রতিদিন হেঁটে যেত সাতজন একবুকের মানিক। খালিশপুর রোটারী স্কুল ছিল তাদের দ্বিতীয় বাড়ি। রিপন, মিলন, সুজন, মারুফ, সাজ্জাদ, তারেক আর সালাউদ্দিন—এই সাতজনের নাম যেন স্কুলের রেজিস্টার খাতায় একটানা লেখা এক অবিশ্বাস্য বন্ধুত্বের গল্প।
রোটারী স্কুলের ক্লাসরুমের শেষ বেঞ্চটা ছিল তাদের রাজত্ব। অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে একপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো সালাউদ্দিনকে দেখে যখন হেডস্যার চোখ রাঙাতেন, পেছনে দাঁড়িয়ে মিটমিট করে হাসত তারেক আর সাজ্জাদ। মারুফের পকেটে সব সময় থাকত চাটনি কিংবা কুলের আচার, যা ক্লাস চলাকালীন বেঞ্চের নিচে হাত চালান হতো অতীব গোপনীয়তায়।
টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই শুরু হতো আসল যুদ্ধ। কার বাড়ি থেকে কী টিফিন এনেছে, তার হিসেব রাখার টাইম কারও ছিল না। সুজনের আনা ডিম-পরোটা আর রিপনের গোলসাইজের আলুর পরোটা কে আগে কেড়াকুড়ি করে খাবে, তা নিয়ে চলত হইচই। টিফিন শেষ হতে না হতেই মাঠের কোণে সালাউদ্দিনের গুটিয়ে আনা প্লাস্টিকের টেনিস বল আর তারেকের বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি ব্যাটে শুরু হয়ে যেত ক্রিকেট। মিলন আবার ছিল অলরাউন্ডার, কিন্তু আউট হলেই তার দাবি—"বল তো কঞ্চির মাথায় লেগেছে, আউট না!"
বৃষ্টির দিনে বৈকালী সিনেমা হলের পাশের গলি দিয়ে হেঁটে আসার সময় সবার জুতো হাতে আর প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গোটানো। মাঝরাস্তায় জমে থাকা জমা জলে পা দিয়ে পানি ছিটানো নিয়ে সাজ্জাদের ওপর বাকি ছয়জনের গণ-আক্রমণ না হলে যেন সেই দিনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত। স্কুলের দেয়ালঘেঁষা দোকানটা থেকে চার আনার ঝালমুড়ি আর মারুফের স্পন্সর করা আইস-ললি ছিল পৃথিবীর সেরা আইটেম।
এসএসসি পরীক্ষার পর শেষ দিনটায় রোটারী স্কুলের ওই চত্বরে যখন সাতজন জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল, তখন কেউ ভাবেনি একসময় খালিশপুরের মেঠো পথ পেছনে ফেলে সবাই ছড়িয়ে পড়বে আলাদা দুনিয়ায়। আজ হয়তো একেকজন একেক শহরে, জীবন আর জীবিকার টানে ব্যস্ততা তুঙ্গে। কিন্তু সালাউদ্দিনের খিলখিল হাসি, রিপনের গম্ভীর উপদেশ, সুজন-মারুফের খুনসুটি, আর মিলন-সাজ্জাদ-তারেকের সেই শেষ বেঞ্চের পাগলামিগুলো আজও রূপসার বাতাসের মতোই তাজা হয়ে আছে তাদের মনে।
আমার জীবনে সৌভাগ্য হয়েছে এই রকম আরো অনেক বন্ধুদের সাথে ছোট্ট বেলা থেকে বেড়ে উঠার। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস টেন অবধি বন্ধুদের সাথে থাকা স্মৃতিগুলো আজও ভাবনার জগতে ঘুরে ফিরে।
সকল বন্ধুদের জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা.......