কুয়াশাচ্ছন্ন এক কার্তিক সকালে শহরের কেন্দ্রস্থলের কদম ফোয়ারা মোড়টা একদম জনশূন্য। সাত বছর আগে এই চত্বরটা ছিল পরিবর্তনের মিছিলে উত্তাল। সেদিন তরুণেরা দেওয়ালে একেছিল নতুন ভোরের ছবি, স্বপ্ন দেখেছিল সমতার। কিন্তু আজ সেই দেওয়ালগুলোর চুনকাম খসে পড়েছে, আর তার ওপর লেখা পুরনো রাজনৈতিক স্লোগানগুলোর জায়গায় শোভা পাচ্ছে নতুন নামে একচ্ছত্র ক্ষমতার জয়গান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রফিক সাহেব জ্যাকেটের পকেটে হাত গুঁজে ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন। তাঁর মনটা ভার হয়ে আছে। গত সপ্তাহে তাঁর প্রিয় ছাত্র অয়নকে রাতারাতি তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অপরাধ? সে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিল, "স্বাধীনতার নাম ভাঙিয়ে মুখ বন্ধ করার এই নতুন খেলা আর কতদিন চলবে?"
রফিক সাহেবের মনে পড়ে গেল সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা।পুরনো ফ্যাসিবাদ উৎখাত হওয়ার পর সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো বাকস্বাধীনতা ফিরবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন হবে। কিন্তু নতুন করে যারা ক্ষমতায় এলো, তারা সূক্ষ্মভাবে পুরনো কৌশলগুলোই আপন করে নিল। ভিন্নমত দমন করতে তৈরি হলো নতুন আইন, যার নাম দেওয়া হলো ‘দেশরক্ষা ও জাতীয় সংহতি আইন’। বিরোধী শক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়ে জেলে পুরতে আগের চেয়েও কম সময় লাগতে শুরু করল। গণমাধ্যমগুলো সত্য লেখার সাহস হারিয়ে একতরফা স্তুতি গাইতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
তিনি তাঁর ডিপার্টমেন্টের দিকে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলেন, ক্যাম্পাসের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে এখন নতুন ‘ডিজিটাল ওয়াচটাওয়ার’ এবং নতুন রাজনৈতিক ক্যাডারদের চোখ। ভয়ের সংস্কৃতি আবার ফিরে এসেছে, শুধু চেহারাটা বদলেছে। যেখানেই মতপ্রকাশের চেষ্টা, সেখানেই ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ দোহাই দিয়ে হামলা। একসময় যারা শোষণের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছিল, তাদেরই অনেকে এখন নতুন ব্যবস্থার দাসত্ব করছে একটুখানি সুযোগ-সুবিধার আশায়।
বিকেলে রফিক সাহেব একটা ছোট চায়ের দোকানে বসলেন। রেডিওতে বাজছিল সরকারের নতুন উন্নয়ন মেগা-প্রজেক্টের জয়গাথা। পাশেই বসে থাকা এক তরুণ শ্রমিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "স্যার, আগেরবারও ভোটের কোনো দাম ছিল না, এবারও কোনো দাম নাই। জিনিসের দাম বাড়ে, কিন্তু আমাদের কথা বলার অধিকার নাই। প্রতিবাদ করলেই ট্যাগ মেরে দেয়।"
রফিক সাহেব বুঝতে পারলেন, একটা দেশের রাজনীতিতে যখন বারবার ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তখন দেশটার আত্মাই মরে যায়। ক্ষমতা যখন একমুখী হয়, তখন শুধু একজন স্বৈরাচারের পতন হয়, কিন্তু ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। নতুন নামে একই পুরোনো শৃঙ্খল চেপে বসে কোটি মানুষের কাঁধে।
সন্ধ্যায় অয়নের মা ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "স্যার, অয়নের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।"
ফোনটা পকেটে রেখে রফিক সাহেব বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। দূরের আকাশে কালবোশেখী মেঘ জমছে। তিনি ভাবলেন, সত্যকে চাপা দিয়ে রাখা যায়, কিন্তু নিঃশেষ করা যায় না। ফ্যাসিবাদ যতবারই নতুন মুখোশ পরে ফিরে আসুক না কেন, শোষণের মাত্রা যখন সহ্যের সীমা ছাড়াবে, রাজপথ আবার কোনো নতুন অয়নের মিছিলেই নতুন করে জেগে উঠবে—এটাই ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম।
নতুন বাংলাদেশের জন্য শুভকামনা ও অভিনন্দন রইলো