সন্ধ্যার আবছা আলোয় ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছিল সোমনাথ। পাশেই বসে তার স্ত্রী তানিয়া মোবাইলে মশগুল। গত কয়েক বছর ধরে তাদের সংসার চলছে একই গতানুগতিক ধারায়—একই ছাদের নিচে দুজন মানুষ, কিন্তু মাঝে এক অদৃশ্য বিশাল দেয়াল। কথা হয় শুধু সংসারের প্রয়োজনটুকু নিয়ে: "আজ বাজারে কী আনবে?", "গ্যাসের বিল দেওয়া হয়েছে?" বা "ছেলেটার স্কুলের ফি দিতে হবে।"
প্রেম বা অনুভূতির আদান-প্রদান উঠে গিয়ে সংসারটা রূপ নিয়েছিল একটা বৈচিত্র্যহীন চুক্তিতে।
ঠিক এই শূন্যতার মাঝেই সোমনাথের জীবনে আসে অবন্তী। কাজের সূত্রে পরিচয়, তারপর আস্তে আস্তে মেসেজ আদান-প্রদান, আর মাঝরাতের গোপন ফোনালাপ। অবন্তী সোমনাথকে এমনভাবে অনুভব করাত, যা সে গত দশ বছরে ভুলেই গিয়েছিল। সোমনাথের মনে হতো, সে আবার জীবন ফিরে পেয়েছে। পরকীয়া সম্পর্কটার মধ্যে সে এক অদ্ভুত শিহরণ আর মুক্তি খুঁজে পেত।
কিন্তু লুকোচুরি খেলা বেশিদিন আড়ালে রাখা যায় না।
একদিন তানিয়া সোমনাথের ব্যাকআপ ফোনে অবন্তীর পাঠানো ভালোবাসার বার্তা আর ছবিগুলো দেখে ফেলে। সেদিন কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি হয়নি, কোনো ভাঙচুরও হয়নি। তানিয়া শুধু সোমনাথের সামনে এসে নিঃশব্দে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছিল। তার চোখে কোনো জল ছিল না, ছিল শুধু এক প্রকাণ্ড শূন্যতা আর ঘৃণা।
পরদিন সকালে সোমনাথ ঘুম থেকে উঠে দেখে ড্রয়িংরুমে তানিয়া বসে আছে, পাশে একটা বড় ট্রাভেল ব্যাগ।
সোমনাথ একটু অপরাধবোধ আর ইতস্তত নিয়ে বলল, "তানিয়া... আমি সত্যি দুঃখিত। একটা ভুল হয়ে গেছে। আমি অবন্তীর সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দেব।"
তানিয়া সোমনাথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকাল। তার গলায় কোনো রাগ ছিল না, ছিল অদ্ভুত এক ঠান্ডা সুর।
"ভুল কোনটা সোমনাথ? আমার সাথে এতগুলো বছর ভালোবাসার নাটক করাটা, নাকি নিজের পছন্দের আর একজন মানুষকে খুঁজে নেওয়াটা?"
সোমনাথ চুপ করে রইল।
তানিয়া শান্ত গলায় বলতে লাগল, "তুমি হয়তো ভেবেছ আমি সংসারের হাঁড়িকুড়ি আর বাচ্চার দায়িত্ব নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে আমার কোনো অনুভূতি ছিল না। কিন্তু একটা সংসারে যখন একজন সঙ্গী অবহেলিত বোধ করে, তখন অন্যজনের খেয়াল রাখা উচিত ছিল। তুমি আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলে, অথচ বাইরে গিয়ে সেই ভালোবাসাই খুঁজে বেড়ালে। ভুল তোমার একা নয়, ভুল হয়তো আমারও ছিল যে আমি তোমার এই দূরত্বটা আগে মেটানোর চেষ্টা করিনি।"
সোমনাথ ভেবেছিল তানিয়া হয়তো কেঁদে-কেটে ঝগড়া করবে, অধিকার দাবি করবে। কিন্তু তানিয়ার এই শান্ত রূপটা তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল।
"আমি বাপের বাড়ি যাচ্ছি সোমনাথ," তানিয়া দাঁড়িয়ে ব্যাগটা হাতে নিল। "যে সম্পর্কে বিশ্বাস নেই, সেখানে জোর করে থাকার কোনো মানে হয় না। তুমি অবন্তীকে নিয়ে সুখী হও।"
তানিয়া ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
পরের কয়েকটা দিন সোমনাথের অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে কাটল। তার মনে হয়েছিল তানিয়া চলে গেলে সে স্বাধীন হবে, অবন্তীর সাথে কোনো বাধা ছাড়াই মেশা যাবে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, অবন্তীর সাথে কথা বলার আগ্রহটাও সে হারিয়ে ফেলল। যে পরকীয়া সম্পর্ক তাকে এত আনন্দ দিচ্ছিল, তানিয়া চলে যাওয়ার পর তা থেকে শুধু অপরাধবোধ আর অনুশোচনা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।
অবন্তীর সাথে দেখা করে সোমনাথ সোজাসুজি জানিয়ে দিল, সে এই সম্পর্ক আর টানতে পারবে না। অবন্তী রেগে গিয়ে বলল, "তুমি তাহলে এতদিন আমার সাথে অভিনয় করছিলে?"
সোমনাথ শান্তভাবে জবাব দিল, "না, আমি ভুল করছিলাম। একটা নতুন ফ্যান্টাসির পেছনে ছুটতে গিয়ে আমি আমার জীবনের আসল ভিত্তিটাই ভেঙে ফেলেছি।"
বাড়ি ফিরে সোমনাথ ফাঁকা ড্রয়িংরুমটায় গিয়ে বসল। চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। চা বানিয়ে এনে সোমনাথ টেবিলের সামনে বসল—যেমনটা সে তানিয়ার সাথে বসত। কিন্তু আজ সোজা তাকিয়ে সে দেখল, উল্টো দিকের চেয়ারটা একদম খালি।
সোমনাথ বুঝতে পারল, সাময়িক রোমাঞ্চ আর ক্ষণিকের আকর্ষণের লোভে সে এমন কিছু হারিয়েছে, যা কোনো নতুন প্রেম বা পরকীয়া দিয়ে আর কখনোই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। ক্ষণিকের মোহ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সম্পর্কের ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসটা চিরকালের জন্য একটা শূন্যতা রেখে যায়।
বিশ্বাসের সাথে স্বাধীনতা উপভোগ করলে জীবন হয়ে উঠে সুখময়।