ঢাকা    রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩
বুড়িগঙ্গা

বাস্তুহারাদের জন্য ৮ কোটি টাকা প্রদানের পরামর্শ ব্যয় ৫৩ কোটি



বাস্তুহারাদের জন্য ৮ কোটি টাকা প্রদানের পরামর্শ ব্যয় ৫৩ কোটি


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত ও অসহায় মানুষের পুনর্বাসন এবং জীবিকা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। তবে প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় কাঠামো নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

কারণ, উপকারভোগীদের জন্য যেখানে সরাসরি অনুদান হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা, সেখানে পরামর্শক, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস পরিচালনা ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ কোটিরও বেশি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জিআইজেড)-এর অর্থায়নে ১ বছর ৯ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পের ওপর রোববার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকল্পের লক্ষ্য খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা উন্নয়ন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সহায়তা এবং প্রায় দেড় হাজার মানুষের জীবিকা উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

তবে বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট বরাদ্দের মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা সরাসরি উপকারভোগীদের অনুদান হিসেবে ব্যয় হবে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। বিপরীতে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, অফিস পরিচালনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।

নথিতে আরও দেখা যায়, মাত্র ৩০০ জন সুবিধাভোগীর জন্য ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব পরামর্শকের সম্মানী বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা প্রকল্পের মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি।

এদিকে সরকারি কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশনা এবং বিদেশ সফরে নিয়ন্ত্রণ থাকলেও প্রকল্পে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ খাতে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্যও রাখা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং অফিস ভবন ভাড়ার জন্য ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আইটি ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামসহ কয়েকটি খাতেও তুলনামূলক বেশি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, ইউটিলিটি বিল, পরিবহন, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, প্রকল্পে সুবিধাভোগী নির্বাচনের সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের একটি অংশ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, পিইসি সভায় প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে পরামর্শক ব্যয়, বিদেশ সফর, অফিস ভাড়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে উচ্চ ব্যয়ের যৌক্তিকতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। প্রয়োজন হলে এসব খাতে ব্যয় কমানোর সুপারিশ করা হবে।

এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এটি একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে দাতা সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রকল্পের কাঠামো ও ব্যয়ের বড় অংশই দাতা সংস্থার নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অনুদানের অর্থ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার শর্ত পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত থাকে। বিদেশ ভ্রমণের বিষয়েও তিনি জানান, সরকারি অনুমোদন না মিললে ওই খাতের অর্থ ব্যয় করা হবে না।

অন্যদিকে, উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় দরিদ্র ও বাস্তুচ্যুত মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, তাহলে বাজেটের অধিকাংশ অর্থ প্রশাসনিক ও পরামর্শক ব্যয়ে চলে যাওয়া উদ্বেগজনক। তাদের মতে, ব্যয় কাঠামো পুনর্বিবেচনা না করলে প্রকল্পটির প্রকৃত সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।

বুড়িগঙ্গা

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬


বাস্তুহারাদের জন্য ৮ কোটি টাকা প্রদানের পরামর্শ ব্যয় ৫৩ কোটি

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

featured Image



জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত ও অসহায় মানুষের পুনর্বাসন এবং জীবিকা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। তবে প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় কাঠামো নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।


কারণ, উপকারভোগীদের জন্য যেখানে সরাসরি অনুদান হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা, সেখানে পরামর্শক, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস পরিচালনা ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ কোটিরও বেশি।


প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জিআইজেড)-এর অর্থায়নে ১ বছর ৯ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পের ওপর রোববার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।


প্রকল্পের লক্ষ্য খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা উন্নয়ন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সহায়তা এবং প্রায় দেড় হাজার মানুষের জীবিকা উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।


তবে বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট বরাদ্দের মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা সরাসরি উপকারভোগীদের অনুদান হিসেবে ব্যয় হবে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। বিপরীতে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, অফিস পরিচালনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।


নথিতে আরও দেখা যায়, মাত্র ৩০০ জন সুবিধাভোগীর জন্য ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব পরামর্শকের সম্মানী বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা প্রকল্পের মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি।


এদিকে সরকারি কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশনা এবং বিদেশ সফরে নিয়ন্ত্রণ থাকলেও প্রকল্পে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ খাতে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্যও রাখা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।


এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং অফিস ভবন ভাড়ার জন্য ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আইটি ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামসহ কয়েকটি খাতেও তুলনামূলক বেশি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, ইউটিলিটি বিল, পরিবহন, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, প্রকল্পে সুবিধাভোগী নির্বাচনের সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের একটি অংশ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।


পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, পিইসি সভায় প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে পরামর্শক ব্যয়, বিদেশ সফর, অফিস ভাড়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে উচ্চ ব্যয়ের যৌক্তিকতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। প্রয়োজন হলে এসব খাতে ব্যয় কমানোর সুপারিশ করা হবে।


এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এটি একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে দাতা সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রকল্পের কাঠামো ও ব্যয়ের বড় অংশই দাতা সংস্থার নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়েছে।


তিনি আরও বলেন, অনুদানের অর্থ হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার শর্ত পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত থাকে। বিদেশ ভ্রমণের বিষয়েও তিনি জানান, সরকারি অনুমোদন না মিললে ওই খাতের অর্থ ব্যয় করা হবে না।

অন্যদিকে, উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় দরিদ্র ও বাস্তুচ্যুত মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, তাহলে বাজেটের অধিকাংশ অর্থ প্রশাসনিক ও পরামর্শক ব্যয়ে চলে যাওয়া উদ্বেগজনক। তাদের মতে, ব্যয় কাঠামো পুনর্বিবেচনা না করলে প্রকল্পটির প্রকৃত সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।


বুড়িগঙ্গা

Buriganga Television is committed to delivering research-based, 
fact-driven, and impartial journalism on the geopolitical economy of the 
Indo-Pacific and the future of humanity to audiences worldwide.

Whatsapp: +8801321780900
Email: burigongatv@gmail.com
Newsroom: newsroom@burigongatv.com

স্বত্ব © বুড়িগঙ্গা মিডিয়া সেন্টার
বাস্তুহারাদের জন্য ৮ কোটি টাকা প্রদানের পরামর্শ ব্যয় ৫৩ কোটি
0:00 0:00
1.0x