মফস্বল সাংবাদিকদের ঐক্যের লড়াইয়ে আহমেদ আবু জাফর: দেড় দশকের একনিষ্ঠ পথচলা
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছেন মফস্বল সাংবাদিকরা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সীমিত সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক সংকট, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ এবং নানা ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করেও তাঁরা প্রতিদিন মানুষের কথা তুলে ধরেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পেশাগত অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে। সেই প্রয়োজন থেকেই মফস্বল সাংবাদিকদের সংগঠিত করার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি আহমেদ আবু জাফর।
আহমেদ আবু জাফরের সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে দেখা যায় মফস্বল সাংবাদিকদের বিচ্ছিন্ন অবস্থান থেকে একটি জাতীয় সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার দীর্ঘ প্রচেষ্টাকে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তোলা, তাঁদের পেশাগত দাবি সামনে আনা এবং সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে সম্মিলিত আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়।
বিএমএসএফের মাধ্যমে তিনি মফস্বল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা, দক্ষতা উন্নয়ন, ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আনার চেষ্টা করেছেন। সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি ও পেশাগত প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ, মানববন্ধন, কলম বিরতি ও স্মারকলিপি কর্মসূচির মতো আন্দোলনেও সংগঠনটির ভূমিকা দেখা গেছে।
বিশেষ করে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে সাংগঠনিক ও পেশাগত অধিকারের বিষয় হিসেবে সামনে আনার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। কোনো মফস্বল সাংবাদিক আক্রান্ত হলে তাঁর পাশে দাঁড়ানো এবং ঘটনার প্রতিবাদে সংশ্লিষ্ট জেলা বা উপজেলার সাংবাদিকদের সংগঠিত করার উদ্যোগ বিএমএসএফের কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সাংবাদিকদের আইনগত নিরাপত্তার প্রশ্নেও আহমেদ আবু জাফর বিভিন্ন সময়ে সোচ্চার হয়েছেন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা, পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা এবং নিরাপত্তাহীনতার বিষয়গুলোকে তিনি সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।
তাঁর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও ঐক্য তৈরির চেষ্টা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিএমএসএফের কমিটি গঠন এবং সাংবাদিকদের সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মকে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
আহমেদ আবু জাফরের চিন্তায় সাংবাদিকদের ঐক্য শুধু একটি সংগঠনের সদস্য হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মসূচিতে পেশাগত স্বার্থে সাংবাদিকদের দল-মত, অঞ্চল ও ব্যক্তিগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান দেখা যায়। সাংবাদিকতা যেন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার না হয়ে মানুষের অধিকার ও সত্য প্রকাশের মাধ্যম থাকে- এই পেশাদারিত্বের প্রশ্নটিও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
মফস্বল সাংবাদিকদের বাস্তবতা ঢাকার সাংবাদিকদের তুলনায় অনেক কঠিন। অনেক সাংবাদিককে স্বল্প পারিশ্রমিকে কাজ করতে হয়, আবার স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপও মোকাবিলা করতে হয়। কোথাও সংবাদ প্রকাশের কারণে মামলা, কোথাও হামলা, কোথাও সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ, এসব বাস্তবতার মধ্যেই তাঁদের কাজ করতে হয়। এই বাস্তবতায় সাংবাদিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং সম্মিলিতভাবে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
আহমেদ আবু জাফরের দীর্ঘ সাংগঠনিক পথচলার মূল্যায়ন করতে গেলে শুধু তাঁর পদ-পদবি দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বরং দেখতে হবে তিনি কতটা সময় ধরে মফস্বল সাংবাদিকদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন কতটা সামনে এনেছেন এবং সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।
তবে যেকোনো দীর্ঘ সাংগঠনিক যাত্রার মতো বিএমএসএফের পথচলাতেও বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্ব, কমিটি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে মতপার্থক্য ও বিতর্কের বিষয় সামনে এসেছে। এসব বিষয়কে অস্বীকার না করে স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক চর্চা, জবাবদিহি ও সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করাই ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।
তারপরও বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করার দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাসে আহমেদ আবু জাফরের ভূমিকা আলাদাভাবে উল্লেখ করার মতো। কারণ তিনি শুধু সাংবাদিকদের সংগঠিত করার কথা বলেননি; দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে সংগঠন বিস্তার, দাবি আদায়ের কর্মসূচি এবং সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
আজ যখন মফস্বল সাংবাদিকরা নানা ধরনের সংকট ও ঝুঁকির মধ্য দিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন, তখন তাঁদের মধ্যে ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা ও পেশাগত সংহতি আরও বেশি প্রয়োজন। সেই জায়গা থেকে আহমেদ আবু জাফরের দেড় দশকের সাংগঠনিক পথচলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মফস্বল সাংবাদিকের শক্তি তাঁর কলমে, আর সেই কলমের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ঐক্য। সেই ঐক্যের আন্দোলনকে দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আহমেদ আবু জাফরের ভূমিকা তাই মফস্বল সাংবাদিক সমাজের ইতিহাসে স্মরণযোগ্য হয়ে থাকবে।
দীর্ঘায়ু হোন আহমেদ আবু জাফর।
- জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা, সাবেক
- সভাপতি, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম, বরগুনা