দেশের স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক সংস্কার ও চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ, সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগ, উপজেলা হাসপাতালগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং স্বাস্থ্যখাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে আধুনিক, জনবান্ধব ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আজকের শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হাত ধরেই চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ হবে।
শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা পেশা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানবসেবার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র। মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে চিকিৎসকরাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হয়ে ওঠেন। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও সহমর্মিতাও একজন চিকিৎসকের অন্যতম প্রধান গুণ হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, একজন চিকিৎসকের আন্তরিক আচরণ ও সঠিক পরামর্শ অনেক সময় ওষুধের মতোই কার্যকর ভূমিকা রাখে। রোগীর প্রতি দায়িত্বশীল ও মানবিক আচরণ স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রতিটি হাসপাতালে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর বিকাশ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ ও ক্যানসারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আগাম স্বাস্থ্যপরামর্শ নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় সম্ভব।
তিনি জানান, জনগণের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী হেলথ কেয়ারার পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাখাতের পর এবার দেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ০২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে এই বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকার ইতোমধ্যে ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব পণ্যের ওপর থেকে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সব উপজেলায় বর্তমানে ৩১ থেকে ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলো পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালু করা হবে। এতে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসা রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছেও সহজলভ্য হবে।
মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে মেডিক্যাল বর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা ও অপসারণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং হাসপাতালগুলো পরিচ্ছন্ন রাখতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।