গাজীপুরের টঙ্গীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এরশাদনগর থেকে উঠে এসে মাত্র ২০ বছর বয়সে সমাজ পরিবর্তনের এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মাহমুদুর রহমান নাঈম। বাল্যবিয়ে, শিশু পাচার, শিশুশ্রম ও যৌন সহিংসতার মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে তাঁর নিরলস লড়াই তাঁকে স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন নাঈম। বর্তমানে গাজীপুরের টঙ্গীর এরশাদ নগরের ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে নানির আশ্রয়ে বসবাস করছেন তিনি। পারিবারিক জীবনের টানাপোড়েন ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম সত্ত্বেও থেমে থাকেনি তাঁর শিক্ষাজীবন। টঙ্গীর বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং সাহাজউদ্দিন সরকার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর বর্তমানে তিনি টঙ্গী সরকারি কলেজের সমাজকর্ম বিভাগে অধ্যয়ন করছেন।
সংগ্রামী এ তরুণের জীবন পরিবর্তনের গল্পটি শুরু হয় ২০১৯ সালে। টঙ্গীর ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী নিপীড়নের শিকার হলে নাঈম সাহসিকতার সাথে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ান। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা থেকে শুরু করে জাতীয় শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ‘১০৯৮’-এ যোগাযোগ করে আইনি সহায়তা চান। প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দীর্ঘ ২১ দিনের অনুসন্ধানের পর মেয়েটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং আদালতের মাধ্যমে অপরাধীর ৫ বছরের কারাদণ্ড হয়। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে নাঈম বলেন, "মেয়েটিকে যখন উদ্ধার করা হলো, তখন মনে হয়েছিল আমি আমার নিজের বোনকেই যেন ফিরে পেলাম।"
শৈশবে লাজুক ও অন্তর্মুখী স্বভাবের নাঈম জনসমক্ষে কথা বলতেও ভয় পেতেন। তবে সমবয়সী কিশোরদের এক শিশু সেবামূলক সভায় অংশ নেওয়ার পর তাঁর জীবনের মোড় ঘোরে। সেখান থেকেই তিনি শিশু অধিকার বিষয়ে সচেতন হন এবং নিজেকে তৈরি করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে শিশু অধিকার, শিশু সুরক্ষা, শিশু সাংবাদিকতা, নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেসি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে একজন দক্ষ সংগঠক ও প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলেন।
গত কয়েক বছরে সমাজসেবায় নাঈমের অর্জন সত্যিই বিস্ময়কর। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তিনি একাগ্রতা ও সাহসিকতার মাধ্যমে ১৯৭টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করেছেন। এছাড়া যৌন হয়রানির শিকার ১৩ জন শিশুর ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, ৩০টি ধর্ষণ মামলায় অপরাধীদের গ্রেপ্তারে সহায়তা এবং অন্তত ১১ জন শিশুকে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন।
বর্তমানে নাঈম আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা 'ওয়ার্ল্ড ভিশন'-এর টঙ্গী এরিয়া প্রোগ্রাম ইউথ ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আন্তর্জাতিক 'লিগেসি প্রজেক্ট'-এর গ্লোবাল চেঞ্জ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন।
বঞ্চিত ও নিপীড়িত শিশুদের অধিকার রক্ষায় নাঈমের এ লড়াই প্রমাণ করে—দৃঢ় মনোবল, ইচ্ছা আর সাহস থাকলে একা একজন মানুষও সমাজে বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।