নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তৎপরতা। সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে পৌর এলাকার বিভিন্ন হাট-বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা। কে ধরবেন পৌরসভার হাল, কেমন মেয়র চান ভোটাররা—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপুর পৌরসভাটি বর্তমানে নয়টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, যানজট নিরসন, পরিকল্পিত সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং নাগরিক সেবার ডিজিটালাইজেশন। পাশাপাশি নদী-খাল সংস্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন ও শহরের সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে ভোটারদের আলোচনায়।
২০১৬ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিকল্পনার অভাবে এখনো অনেক নাগরিক সমস্যা রয়ে গেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং জবাবদিহিমূলক পৌর প্রশাসন।
এমন প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের আলোচনায় উঠে এসেছে আলহাজ্ব জামাল উদ্দিন মাস্টারের নাম। উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল উদ্দিন মাস্টার দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। তাঁর সমর্থকদের দাবি, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততার কারণে পৌর এলাকার ভোটারদের মধ্যে তাঁর একটি পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, সড়ক, ড্রেনেজ, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবার উন্নয়নকে তাঁরা অগ্রাধিকার দিতে চান। তাঁদের একটি অংশ সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জামাল উদ্দিন মাস্টারকে পছন্দের তালিকায় রাখছেন।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুর্গাপুর সাংবাদিক ফোরামের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন জামাল উদ্দিন মাস্টার।
তিনি বলেন, “আমি যদি মেয়র নির্বাচিত হই, ওই মেয়র আমি নই—পৌরবাসী সবাই মেয়র। সকলের মতামত ও পরামর্শ নিয়ে সুখে-দুঃখে, সংকট ও দুর্যোগে পৌরবাসীর পাশে থেকে উন্নয়ন করতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচিত হলে দুর্গাপুর পৌরসভাকে মাদক, ইভটিজিং, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত করার পাশাপাশি নাগরিক সেবাকে আরও সহজ ও জবাবদিহিমূলক করতে কাজ করব।”
দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে জামাল উদ্দিন মাস্টার বলেন, ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে যুবদল ও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, “দুর্গাপুর-কলমাকান্দার অভিভাবক জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আমার রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও পরামর্শকে ধারণ করেই দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে কাজ করে যাচ্ছি।”
নিজের রাজনৈতিক জীবনের নানা প্রতিকূলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে মামলা-হামলা ও হয়রানির শিকার হলেও দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাননি। ৫ আগস্টের পর পৌর এলাকার ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ বজায় রাখতে নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
জামাল উদ্দিন মাস্টার জানান, ২০১৫ ও ২০২২ সালের পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ওই দুই নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তাঁকে তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
দুর্গাপুর পৌরসভা নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পৌর এলাকায় শিশুপার্ক, অডিটোরিয়াম, স্থায়ী মঞ্চ, পৌর গ্রন্থাগার, আধুনিক বাস টার্মিনাল, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও আলাদা স্বাস্থ্য ইউনিট গড়ে তুলতে চান। পাশাপাশি শহরকে আলোকসজ্জার আওতায় আনা, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সড়ক বিভাজক ও সৌন্দর্যবর্ধন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চত্বর নির্মাণ এবং সব পৌরসেবা ডিজিটালাইজ করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
এ ছাড়া ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনাগুলোর উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মডেল প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া এবং পৌরসভার সব কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশের মতে, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তার কারণে জামাল উদ্দিন মাস্টার সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচিত একজন। তবে দলীয় মনোনয়ন শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জোটে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে দুর্গাপুর পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা, দলীয় মনোনয়ন এবং নির্বাচনী মাঠের সমীকরণ নিয়ে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত ও ভোটারদের রায়ই নির্ধারণ করবে দুর্গাপুর পৌরসভার আগামী দিনের নেতৃত্ব।