প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এনজিও সংস্থার নাম ব্যবহার করে পথশিশুদের নিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং সেই স্কুলের ছবি ও কার্যক্রম দেখিয়ে সমাজের সুধীজন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন শ্রেণির দাতার কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে শুভ্র সেন শর্মা ও তাঁর ছেলে রাজ্য সেন শর্মার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের পরিচালিত এসব স্কুলের নাম ‘নিরন্তন ভালোবাসা’। একটি এলাকায় মাত্র তিন থেকে ছয় মাস কার্যক্রম চালানোর পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে পরিস্থিতি বুঝে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুভ্র সেন শর্মা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। তাঁর বাড়ি জামালপুর জেলায়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তিনি কুড়িগ্রামে এসে ব্র্যাক, ছিন্নমুকুলসহ বিভিন্ন এনজিওতে চাকরি করেন। বর্তমানে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে কুড়িগ্রামে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, একসময় ছিন্নমুকুল থেকে কর্মহীন হওয়ার পর এনজিও কার্যক্রমের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শিশুদের নিয়ে স্কুল পরিচালনার উদ্যোগ নেন শুভ্র সেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দালালের মাধ্যমে অভিভাবকদের বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে ভাড়া করা জায়গায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে স্কুলের বিভিন্ন কার্যক্রমের ছবি সংগ্রহ করে দেশ-বিদেশের দাতাদের কাছে উপস্থাপন করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট সময় পর কার্যক্রম গুটিয়ে অন্য এলাকায় চলে যেতেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কার্যক্রমে শুভ্র সেন শর্মার অন্যতম সহযোগী তাঁর ছেলে রাজ্য সেন শর্মা ওরফে রাজ্য জ্যোতি। বাবার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে রাজ্য কিশোরদের নিয়ে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মারমুখী আচরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে শুভ্র সেন শর্মা ও তাঁর ছেলে রাজ্য সেন শর্মার বিরুদ্ধে কুড়িগ্রাম সদর থানা, পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযোগকারী কুড়িগ্রাম পৌরসভার পাওয়ার হাউস পাড়ার প্রবীণ নাগরিক মজনুজ্জামান মজনু।
লিখিত অভিযোগে জানা যায়, মজনুজ্জামান মজনু কুড়িগ্রাম পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হিঙ্গনরায় ডাকবাংলো পাড়ায় অবস্থিত সিআরসি স্কুল ও মোক্তব এন্ড ট্রাস্ট উন্নয়ন সমিতির সভাপতি।
অভিযোগের প্রথমটিতে বলা হয়, শুভ্র সেন শর্মা সিআরসি সমিতির নেতৃবৃন্দের কাছে স্কুল পরিচালনার জন্য একটি ঘর ভাড়া চান। সেখানে তিনি ‘পথকলি ট্রাস্ট’-এর শিশুদের নিয়ে স্কুল পরিচালনা এবং রাস্তাঘাট ও স্কুল সংস্কারের প্রস্তাব দেন।
সমিতির নেতৃবৃন্দ তাঁর উৎসাহ ও উদ্যোগ দেখে ২০২৪ সালের ৩ মার্চ মৌখিক চুক্তিতে মাসিক এক হাজার টাকা ভাড়ায় একটি ঘর দেন। এরপর সেখানে স্কুল কার্যক্রম শুরু হয়। অভিযোগকারীর দাবি, টানা ২৯ মাস ঘরটি ব্যবহার করা হলেও রশিদের মাধ্যমে মাত্র তিন মাসের ৩ হাজার টাকা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৬ মাসের ২৬ হাজার টাকা বকেয়া রেখে কোমলমতি শিশুদের সেখানে রেখে স্কুলঘর তালাবদ্ধ করে চলে যান শুভ্র সেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চলতি বছরের ২৫ জুলাই দিবাগত রাতে তালাবদ্ধ ওই স্কুলঘরে চুরির ঘটনা ঘটে। সেখান থেকে একটি সিলিং ফ্যান চুরি হয়, যার আনুমানিক মূল্য ২ হাজার ৫০০ টাকা।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে অভিযোগকারী আরও জানান, চুরি হওয়া স্কুলঘরের উত্তর পাশে সিআরসি কার্যালয়ের একটি কক্ষে স্টিলের আলমারিতে ১০টি সেলাই মেশিন রাখা রয়েছে। এসব মেশিনও চুরি হতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।
স্কুলঘরের ভাড়া ও চুরির বিষয়ে জানতে শুভ্র সেন শর্মার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীর দাবি। পরে বিষয়টি জানিয়ে পুলিশ সুপার ও কুড়িগ্রাম সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে শুভ্র সেন শর্মার সহযোগী হিসেবে আবু সাঈদ মোল্লার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় রাজ্য সেন শর্মা ওরফে রাজ্য জ্যোতি ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগকারী মজনুজ্জামান মজনুকে কিশোরদের নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, সম্মানহানি এবং দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিজের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে রাজ্যের বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযোগ দেন মজনুজ্জামান।
অভিযোগের বিষয়ে মজনুজ্জামান মজনু বলেন, ‘আমি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা উদঘাটন এবং ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
অভিযুক্ত শুভ্র সেন শর্মার বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যবহৃত ০১৭২৭৩৭৪০৯৫ ও ০১৭১৮৩২৪৮৮৮ নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রাম সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন বলেন, থানায় অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।