লালমনিরহাট রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের অফিস সহকারী নুরুজ্জামান সরকার সোহেল এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অফিস সহকারী সাইদুর ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তার, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সাধারণ কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন রেল কর্মচারী।
অভিযোগকারীদের দাবি, ১৫ নভেম্বর ২০২০ থেকে একটি স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকাসহ বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যমে নুরুজ্জামান সরকার সোহেল ও তাঁর চাচা সাইদুর ইসলামের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, নুরুজ্জামান সরকার সোহেলের বাবা আজিজুর রহমান ওরফে "ভুয়া আজিজ" কাউনিয়ার সাবেক ফয়েজম্যান ছিলেন। তাঁর কাছে রেলওয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার নকল সিল ছিল এবং সেগুলো ব্যবহার করে অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নুরুজ্জামান সরকার সোহেল ট্রাফিক বিভাগের অফিস সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে রেলওয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার এবং তাঁর চাচা সাইদুর ইসলাম ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক। রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে-বেনামে সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সোহেল ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ঠিকাদারদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং নিজেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি বিএনপি-সমর্থিত একটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সাইদুর ইসলাম বিএনপির রেল শ্রমিক দলের একজন সক্রিয় নেতা বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সোহেল ও সাইদুর সরকারি নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে নিজেদের ইচ্ছামতো অফিসে আসা-যাওয়া করেন। তাদের পরিবারের ৮ থেকে ১০ জন সদস্য রেলওয়েতে কর্মরত থাকায় তারা বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সোহেলের বোন আরজিনার কর্মস্থল রমনা বাজার স্টেশনের বুকিং অফিস হলেও অনুসন্ধানকালে তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি; পরে তাকে লালমনিরহাট ডিটিএস অফিসে দেখা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভয়ভীতি দেখানো, হয়রানি এবং মিথ্যা মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। সাধারণ রেল কর্মচারীরা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে অভিযোগ করেছেন, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সোহেল-সাইদুরের প্রভাব রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২০ সালে রংপুর অঞ্চলের তৎকালীন দুদক পরিচালক আব্দুল করিমের কাছে এ-সংক্রান্ত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত কার্যকরভাবে এগোয়নি। এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, শাকিলা ও শারমিন নামে দুই নারী কর্মীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদায়ন করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রেও সোহেলের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
সাধারণ রেল কর্মচারীরা সোহেল ও সাইদুরের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নুরুজ্জামান সরকার সোহেল ও সাইদুর ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।