আধুনিক পৃথিবীর সমস্ত আলো-ঝলমলে চেনা রূপের আড়ালে এমন কিছু সমাজ রয়েছে, যারা স্বেচ্ছায় নিজেদের শত বছরের পুরনো এক জীবনযাত্রার মধ্যে বন্দি করে রেখেছেন। তাদেরই একজন হলেন 'হাসিদিক ইহুদি' (Hasidic Jews)। পশ্চিমা বিশ্বের ব্যস্ত নগরী নিউ ইয়র্ক (বিশেষ করে ব্রুকলিনের উইলিয়ামসবার্গ বা ক্রাউন হাইটস), জেরুজালেম বা লন্ডনের Stamford Hill-এর রাস্তায় হাঁটলে কালো পোশাক, লম্বা দাড়ি, এবং কানের দু'পাশে পেঁচানো ঝুলফি (Peyot) পরা কিছু মানুষকে দেখা যায়। তারা বাহ্যিকভাবে আধুনিক বিশ্বের অংশ মনে হলেও, ভেতরের জীবনযাপন পুরোপুরি ভিন্ন।
উৎপত্তি ও দর্শন
১৮ শতকে পূর্ব ইউরোপে (বর্তমান ইউক্রেন অঞ্চলে) 'বাল শেভ তোভ' (Baal Shem Tov) নামক এক আধ্যাত্মিক গুরুর হাত ধরে হাসিদিক আন্দোলনের সূচনা হয়। 'হাসিদিক' শব্দের অর্থ "ধার্মিক" বা "পবিত্র"। সাধারণ বা দরিদ্র ইহুদিদের কাছে ধর্মকে প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা থেকে মুক্ত করে ঈশ্বরপ্রেম, আনন্দ, নাচ-গান এবং আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই মতবাদের মূল উদ্দেশ্য।
জীবনযাত্রার মূল ভিত্তি
কঠোর পোশাকবিধি: হাসিদিক পুরুষরা সাধারণত লম্বা কালো কোট (Bekishe), সাদা শার্ট, কালো টুপি বা বিশেষ অনুষ্ঠানে শ্যাবাট উপলক্ষে পশম দিয়ে তৈরি উঁচু টুপি (Shtreimel) পরেন। নারীরা অত্যন্ত শালীন পোশাক (Tzniut) পরেন—লম্বা স্কার্ট, ফুল হাতা জামা। বিবাহিত নারীরা মাথায় স্কার্ফ (Tichel) বাঁধেন অথবা পরচুলা (Wig) ব্যবহার করেন, কারণ তাদের নিজস্ব চুল স্বামী ছাড়া অন্য কারো দেখা নিষেধ।
আধুনিক প্রযুক্তি বর্জন: বেশিরভাগ হাসিদিক পরিবারে টিভি, ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। যোগাযোগের জন্য তারা তথাকথিত 'কোশার ফোন' (যাতে ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া থাকে না) ব্যবহার করেন।
ভাষা ও শিক্ষা: তারা দৈনন্দিন কথাবলা ও যোগাযোগের জন্য হিব্রুর বদলে 'ইদিশ' (Yiddish - জার্মান ও হিব্রুর মিশ্রণ) ভাষা ব্যবহার করেন। শিশুদের শিক্ষার মূল কেন্দ্র হলো তাওরাত (Torah) এবং তালমুদ (Talmud) পাঠ।
বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্নতা: তারা নিজস্ব ছকে তৈরি পাড়ায় বাস করেন। সেখানে তাদের নিজস্ব আদালত, নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস (Hatzalah), নিরাপত্তা সংস্থা (Shomrim) এবং সুপারমার্কেট রয়েছে। বাইরের জগতের "দূষণ" বা ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা থেকে সমাজকে রক্ষা করতেই এই কঠোরতা।
রেবে ও সামাজিক কাঠামো
হাসিদিক সমাজ বিভিন্ন উপ-সম্প্রদায়ে (যেমন: Satmar, Chabad-Lubavitch, Belz) বিভক্ত। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে থাকেন একজন আধ্যাত্মিক গুরু, যাকে বলা হয় 'রেবে' (Rebbe)। অনুসারীদের কাছে রেবে কেবল একজন নেতাই নন, বরং ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগের এক পবিত্র মাধ্যম। বিয়ে, ব্যবসা, চিকিৎসা থেকে শুরু করে জীবনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনুসারীরা রেবের পরম পরামর্শ ও আশীর্বাদ নিয়ে থাকেন।
কেন এই সমাজ ঘিরে রহস্য?
হাসিদিকদের বন্ধ দরজার পেছনের জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই। একদিকে যেমন তাদের মধ্যে তীব্র পারিবারিক বন্ধন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অপরাধমুক্ত শান্ত পরিবেশ দেখা যায়; অন্যদিকে আবার কঠোর নিয়মকানুন, নারী স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং সমাজ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাওয়া মানুষদের (Off-the-derech) ওপর সামাজিক বয়কটের মতো কঠোর বাস্তবতাও বিদ্যমান।
Netfilx-এর বিখ্যাত মিনি-সিরিজ Unorthodox বা Shtisel-এর মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে এই রহস্যময় সমাজের অভ্যন্তরীণ কিছু চিত্র পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দ্রুত বদলে যাওয়া এই কৃত্রিম প্রযুক্তির যুগে হাসিদিক ইহুদিরা নিজেদের আভিজাত্য, ঐতিহ্য আর ধর্মীয় গোঁড়ামিকে পরম মায়ায় আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা এক অন্য জগতের বাসিন্দা।
জানার শেষ নেই..... আর বুঝার কোনো বয়স নেই