রাজধানীর দক্ষিণ দনিয়া এলাকায় আইনিভাবে বিবাহবিচ্ছেদের প্রায় তিন বছর পর সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করার অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী প্রবাস-ফেরত মো. কামাল হোসেনের অভিযোগ, তাঁর আকস্মিক ব্রেন স্ট্রোক ও পক্ষাঘাতগ্রস্ততার সুযোগ নিয়ে সাবেক স্ত্রী খন্দকার জান্নাতুল ফেরদৌস কৌশল ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের তিনটি ফ্ল্যাট নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। পরে ওই সম্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় বিষয়টি আড়াল করতে তাঁর বিরুদ্ধে পাল্টা হিসেবে যৌতুক মামলা করা হয়েছে বলে দাবি কামাল হোসেনের।
প্রাপ্ত নথিপত্র ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর মো. কামাল হোসেন ও খন্দকার জান্নাতুল ফেরদৌস ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে হলফনামার মাধ্যমে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে দাম্পত্য কলহ ও পারিবারিক বিরোধের জেরে ২০২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭(১) ধারা অনুযায়ী কামাল হোসেন তাঁর স্ত্রীকে তালাক-এ-বায়েন (প্রথম তালাক) দেন।
কামাল হোসেনের পক্ষ থেকে দেওয়া কাগজপত্র অনুযায়ী, তালাকের নোটিশটি ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠানো হয়। ডাক বিভাগের ট্র্যাকিং রেকর্ডে (বারকোড নম্বর: DL841179257BD) দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর খন্দকার জান্নাতুল ফেরদৌস নিজে নোটিশটি গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রাপ্তি স্বীকারপত্রও রয়েছে বলে ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, বিবাহবিচ্ছেদের প্রায় এক বছর পর খন্দকার জান্নাতুল ফেরদৌস তাঁর মেয়েকে নিয়ে অসহায় অবস্থার কথা জানিয়ে সাবেক স্বামীর কাছে মানবিক আশ্রয় চান। বিষয়টি বিবেচনা করে কামাল হোসেন তাঁর মালিকানাধীন ১১ তলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ দেন। একই সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি চেম্বার বা কার্যালয় ব্যবহারের অনুমতিও দেন বলে দাবি তাঁর।
এর কিছুদিন পর প্রবাস-ফেরত কামাল হোসেন আকস্মিকভাবে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর অভিযোগ, শারীরিকভাবে অসুস্থ ও চিকিৎসাধীন থাকার সুযোগ নিয়ে সাবেক স্ত্রী তাঁর ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করেন। একপর্যায়ে চিকিৎসা ও সেবাশুশ্রূষার আড়ালে চাপ প্রয়োগ করে তাঁর মালিকানাধীন ভবনের চারটি ফ্ল্যাট ও একটি চেম্বারের মধ্যে তিনটি ফ্ল্যাট নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কামাল হোসেনের দাবি, শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ার পর তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর সাবেক স্ত্রীকে সম্পত্তি হস্তান্তরের কারণ জানতে চাইলে বিরোধ তৈরি হয়। তাঁর অভিযোগ, ওই সম্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরই বিষয়টি ভিন্ন খাতে নিতে তাঁর বিরুদ্ধে যৌতুক মামলা করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৯ জুন খন্দকার জান্নাতুল ফেরদৌস মো. কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ৪৭০/২০২৬ বলে ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
কামাল হোসেন বলেন, “২০২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আমাদের আইনগতভাবে বিচ্ছেদ হয়েছে। তালাকের নোটিশও তিনি নিজে গ্রহণ করেছেন। এরপর প্রায় তিন বছর পর আমার বিরুদ্ধে যৌতুক মামলা করা হয়েছে। আমি মনে করি, আমার সম্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরই আমাকে চাপে রাখার উদ্দেশ্যে এই মামলা করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি অসুস্থ থাকার সময় কীভাবে আমার সম্পত্তি হস্তান্তর হলো, সেটিই এখন আমার মূল প্রশ্ন। আমি আমার কষ্টার্জিত সম্পত্তি ফেরত ও ন্যায়বিচার চাই।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে খন্দকার জান্নাতুল ফেরদৌসের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আমি কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছুক নই এবং কোনো বক্তব্য দিতে রাজি নই। আমি কোনো বক্তব্য দেব না। তবে আপনারা যদি আমার বিরুদ্ধে কোনো নিউজ করেন বা কোনো লেখা প্রকাশ করেন, তাহলে আমি আপনাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
অভিযোগের বিষয়ে আইনগত অবস্থান জানতে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বিবাহবিচ্ছেদের পর সাবেক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট আইনি দাবি বা মামলা গ্রহণযোগ্য কি না, তা নির্ভর করে মামলার অভিযোগ, ঘটনার সময়কাল, প্রযোজ্য আইন ও আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ওপর। ফলে শুধু বিবাহবিচ্ছেদের সময়কাল বিবেচনা করে মামলাটিকে আইনগতভাবে অবৈধ বা নজিরবিহীন বলা যায় না।
অন্যদিকে, সম্পত্তি হস্তান্তরের অভিযোগ সত্য কি না, তাও সংশ্লিষ্ট দলিল, রেজিস্ট্রি রেকর্ড, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই সাপেক্ষে নির্ধারণের বিষয়। কামাল হোসেন এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং তাঁর কষ্টার্জিত সম্পত্তি উদ্ধারে আইনগত সহায়তা ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।
চলবে...