মাত্র তিন বছর দুই মাস বয়সে নাচ শেখা শুরু। তখন হয়তো বুঝতেই পারেননি, এই পথই একদিন তাকে এনে দেবে সম্মাননা, পরিচিতি এবং শিল্পীজীবনের এক অনন্য অবস্থান। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোট্ট মেয়েটিই আজ নৃত্যশিল্পী ও ভয়েসওভার শিল্পী—দুই পরিচয়েই সমান স্বচ্ছন্দ। তিনি জয়িতা রশীদ।
সম্প্রতি ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’ অর্জন করেছেন জয়িতা। দীর্ঘদিন পর কোনো নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েই প্রথম স্থান অর্জন তার কাছে হয়ে উঠেছে বিশেষ এক অনুভূতির নাম।
জয়িতা বলেন, “আমি আগে থেকেই জানতাম না যে কোনো প্রতিযোগিতা হবে। আগের দিন রাতে খবর পাই। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই অংশ নিয়েছিলাম। তাই কোনো প্রত্যাশা ছিল না। প্রথম হওয়ার খবরটা শুনে মনে হয়েছে, দীর্ঘদিনের সাধনার একটা স্বীকৃতি পেলাম।”
মায়ের হাত ধরেই শিল্পের শুরু
জয়িতার শিল্পীজীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার মা। তিনিই প্রথম মেয়ের নাচের প্রতিভা চিনতে পেরেছিলেন এবং খুব ছোট বয়সেই নাচ শেখানো শুরু করেন।
তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ছোটবেলায় নাচের ক্লাসে যেতে চাইতেন না জয়িতা। নৃত্যগুরুকে ভয় পেতেন, অনেক সময় কান্নাও করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ভয় কেটে যায়। নাচ হয়ে ওঠে তার আত্মপ্রকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা।
তার ভাষায়, নাচ শুধু একটি শিল্প নয়; এটি অনুভূতি প্রকাশের এক অসাধারণ মাধ্যম। মঞ্চে উঠলেই যেন নিজের সঙ্গে অন্য এক সংযোগ তৈরি হয়।
কার্টুন দেখে শুরু, এখন পেশাদার ভয়েসওভার শিল্পী
নাচের পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ অনুকরণ ছিল জয়িতার অন্যতম প্রিয় শখ। ঘুম থেকে উঠে কার্টুন দেখা, তারপর প্রিয় চরিত্রগুলোর কণ্ঠ নকল করে পরিবারের সবাইকে শোনানো—এভাবেই বেড়ে ওঠে তার কণ্ঠ অনুকরণের দক্ষতা।
করোনাকালে ২০২০ সালে অনলাইনে একটি ভয়েস প্রতিযোগিতা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেখানে বিভিন্ন অভিনেতার কণ্ঠ অনুকরণ হলেও কার্টুন চরিত্র নিয়ে খুব কম মানুষ কাজ করছিলেন। নিজের ছোটবেলার অভ্যাসকে কাজে লাগিয়ে সাহস করে ভিডিও তৈরি করেন জয়িতা।
প্রথম ভিডিওতেই পান ব্যাপক সাড়া। এরপর একের পর এক ভিডিও মানুষের প্রশংসা কুড়াতে থাকে। শখের সেই কাজই ধীরে ধীরে পরিণত হয় পেশায়।
‘ভয়েসওভার মানেই কণ্ঠ দিয়ে অভিনয়’
জয়িতার মতে, একজন ভয়েসওভার শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু সুন্দর কণ্ঠ নয়; বরং কণ্ঠের মাধ্যমে অভিনয় করার ক্ষমতা।
তিনি বলেন, “কোনো চরিত্রের আনন্দ, দুঃখ, ভয় কিংবা বিস্ময়—সবকিছুই কণ্ঠের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হয়। শুধু সংলাপ বললেই হয় না, সেই আবেগও পৌঁছে দিতে হয় শ্রোতার কাছে।”
এই দক্ষতা অর্জনে তাকে সাহায্য করেছে সংগীতচর্চাও। নাচের পাশাপাশি তিনি সংগীতশিল্পী সুজিত মোস্তফার কাছে গান শিখেছেন। নিয়মিত রেওয়াজের ফলে কণ্ঠের বিভিন্ন রেঞ্জ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ হয়ে ওঠেন, যা পরে ভয়েসওভারে বড় ভূমিকা রাখে।
চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে এগিয়ে চলা
ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করায় বাংলা উচ্চারণ নিয়ে শুরুতে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছিল জয়িতাকে। কঠিন বাংলা শব্দ, সঠিক উচ্চারণ, কোথায় বিরতি দিতে হবে কিংবা কোন শব্দে কতটা আবেগ প্রকাশ করতে হবে—এসব আয়ত্ত করতে দীর্ঘ সময় অনুশীলন করেছেন।
তিনি জানান, এখন কোনো স্ক্রিপ্ট হাতে পেলেই প্রথমে উচ্চারণ ঠিক করেন। এরপর পুরো স্ক্রিপ্টের আবেগ, টোন ও গতি নির্ধারণ করে রেকর্ডিং করেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, মানুষের আবেগই বড়
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে কণ্ঠ তৈরি ও অনুকরণের বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও জয়িতা এটিকে ভয় হিসেবে দেখেন না।
তার মতে, প্রযুক্তি হয়তো কণ্ঠের অনুকরণ করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের মতো করে পরিস্থিতি বুঝে তাৎক্ষণিক আবেগ প্রকাশ করা এখনো সম্ভব নয়। একজন পেশাদার ভয়েসওভার শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার মানবিক অনুভূতি ও অভিনয় দক্ষতা।
‘নাচে শরীর কথা বলে, ভয়েসওভারে কণ্ঠ’
নাচ ও ভয়েসওভার—দুই মাধ্যমকে আলাদা করেও তাদের ভেতরের মিলটি খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন জয়িতা।
তিনি বলেন, “আমি যখন নাচি, তখন আমার শরীর কথা বলে। আর যখন ভয়েসওভার করি, তখন আমার কণ্ঠ কথা বলে।”
তার মতে, নাচে যেমন শরীরের অঙ্গভঙ্গি ও মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করা হয়, তেমনি ভয়েসওভারে কণ্ঠের ওঠানামা, টোন ও আবেগ দিয়ে একই কাজ করতে হয়।
প্রতিযোগিতা থেকে দূরে, আবারও সাফল্যের মঞ্চে
শৈশব থেকেই অসংখ্য নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার পেয়েছেন জয়িতা। তবে প্রায় চার বছর আগে তার নৃত্যগুরুর একটি কথায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া কমিয়ে দেন।
গুরু বলেছিলেন, “অনেক পুরস্কার তো পেয়েছিস, এবার নতুনদের সুযোগ দে।”
সেই কথা হৃদয়ে গেঁথে যায়। তাই দীর্ঘদিন প্রতিযোগিতা থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু এবারের প্রতিযোগিতায় এক সিনিয়রের অনুরোধে শেষ দিনে হঠাৎ অংশ নেন। কোনো প্রস্তুতি ছিল না, প্রত্যাশাও ছিল না। অথচ সেখান থেকেই আসে ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’।
সামনে আরও বড় স্বপ্ন
জয়িতার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, কোনো জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্রের অফিসিয়াল কণ্ঠ দেওয়ার সুযোগ পাওয়া। একই সঙ্গে তিনি চান, ভবিষ্যতে অন্য শিল্পীরাও যেন তার তৈরি কোনো চরিত্র বা তার কণ্ঠ অনুকরণ করেন।
খুলনায় শেকড়, ঢাকায় বেড়ে ওঠা জয়িতা রশীদের শিল্পীজীবনের গল্প তাই শুধু একজন নৃত্যশিল্পী কিংবা ভয়েসওভার শিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস, পরিবারের অনুপ্রেরণা এবং শিল্পের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ।
দুই ভিন্ন শিল্পমাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে তিনি এগিয়ে চলেছেন নতুন স্বপ্নের পথে। তার বিশ্বাস, শিল্পের ভাষা বদলাতে পারে, কিন্তু অনুভূতির শক্তি কখনো বদলায় না।