“আর পাঁচ মিনিট দেখেই ফোনটা রেখে দেব”—ঘুমানোর আগে নিজের সঙ্গে এমন প্রতিশ্রুতি দেন অনেকেই। কিন্তু সেই পাঁচ মিনিট কখন ৩০ মিনিট, কখনো এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়, তা টেরই পাওয়া যায় না। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা বিভিন্ন নিউজফিডে একের পর এক কনটেন্ট দেখতে দেখতে ঘুমের সময় পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যখন ফোনটি পাশে রাখা হয়, তখন ঘুমানোর নির্ধারিত সময় অনেকটাই পেরিয়ে গেছে।
বর্তমান জীবনে মোবাইল ফোন কাজ, পড়াশোনা, যোগাযোগ ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু দিনের শেষে বিশ্রামের সময়েও যদি ফোনই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সঙ্গী, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে ঘুমের রুটিনকে এলোমেলো করতে পারে। বিশেষ করে বিছানায় যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করার অভ্যাসটি হয়ে উঠতে পারে রাত জাগার অন্যতম কারণ।
‘আরেকটা ভিডিও’ থেকেই শুরু
অনেকের ক্ষেত্রে রাতে ফোন ব্যবহারের শুরুটা হয় খুব সাধারণভাবে। হয়তো দিনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মেসেজ দেখা, একটি ভিডিও দেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারা। এরপর অ্যালগরিদমের সাজানো একের পর এক ভিডিও সামনে আসতে থাকে। একটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি শুরু হয়।
কনটেন্টের এই ধারাবাহিকতা মানুষকে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে আটকে রাখতে পারে। বিশেষ করে ছোট ভিডিওর ক্ষেত্রে ‘শেষ’ বলে নির্দিষ্ট কোনো জায়গা থাকে না। ফলে ব্যবহারকারী নিজেই ঠিক না করলে স্ক্রলিং বন্ধ করার সময় আসে না।
এখানেই তৈরি হয় একটি সমস্যা—ঘুমানোর জন্য বিছানায় যাওয়া হলেও মস্তিষ্ক ও মনোযোগ তখনো বিনোদনমূলক কনটেন্টের সঙ্গে ব্যস্ত থাকে।
ঘুমের সময় পিছিয়ে গেলে কী হয়?
এক রাত দেরিতে ঘুমালেই বড় কোনো সমস্যা হবে—এমন নয়। কিন্তু নিয়মিত ঘুমের সময় পিছিয়ে যেতে থাকলে দৈনন্দিন জীবনে ক্লান্তি, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা এবং পরদিন স্বাভাবিক কাজকর্মে অনীহা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থী বা যাদের সকালে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কর্মস্থলে যেতে হয়, তাদের জন্য নিয়মিত রাত জাগা পরদিনের কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলতে পারে।
অনেক সময় মানুষ মনে করেন, ‘আমি তো বিছানায় ছিলাম, তাই বিশ্রাম নিয়েছি।’ কিন্তু বিছানায় থাকা আর পর্যাপ্ত ঘুম হওয়া এক বিষয় নয়। ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও শান্ত পরিবেশ প্রয়োজন।
ফোনের আলোই কি একমাত্র সমস্যা?
রাতে মোবাইল ব্যবহারের প্রসঙ্গে সাধারণত স্ক্রিনের আলো নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। তবে বিষয়টি শুধু আলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। ফোনে কী দেখা হচ্ছে, কতক্ষণ দেখা হচ্ছে এবং সেই কনটেন্ট মনের ওপর কী প্রভাব ফেলছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ, ঘুমানোর আগে উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও, তর্ক-বিতর্কের পোস্ট, নেতিবাচক খবর বা অতিরিক্ত তথ্য দেখলে মন শান্ত হতে সময় লাগতে পারে। ফলে ফোন বন্ধ করার পরও মাথায় নানা বিষয় ঘুরতে থাকে।
অন্যদিকে, শান্ত কোনো বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা কিংবা নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটানো ঘুমের আগে তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক রুটিন তৈরি করতে পারে।
ঘুমের আগে ফোন ব্যবহারের অভ্যাস কমাবেন যেভাবে
রাতের স্ক্রলিং বন্ধ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করা। একদিনে কয়েক ঘণ্টার অভ্যাস পুরোপুরি বন্ধ করার চেষ্টা না করে ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করা সহজ।
প্রথমে ঘুমানোর ২০-৩০ মিনিট আগে ফোন সরিয়ে রাখার অভ্যাস করা যেতে পারে। পরে সময়টি আরও বাড়ানো যায়। ফোনটি বিছানার পাশে না রেখে একটু দূরে রাখলে অকারণে বারবার হাতে নেওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা যেতে পারে। কারণ প্রতিটি নোটিফিকেশনই আবার ফোন হাতে নেওয়ার একটি কারণ তৈরি করে।
‘ডু নট ডিস্টার্ব’ হতে পারে সহজ সমাধান
অনেক স্মার্টফোনেই ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ বা ঘুমের সময় নির্ধারণের সুবিধা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের পর অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখলে রাতে ফোন ব্যবহারের প্রবণতা কমানো সহজ হতে পারে।
তবে পরিবারের জরুরি যোগাযোগ প্রয়োজন হলে সেটি মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় নম্বর বা যোগাযোগ চালু রাখা যায়।
ফোনের বিকল্প তৈরি করুন
শুধু ‘ফোন ব্যবহার করব না’ বললেই অভ্যাস পরিবর্তন কঠিন হতে পারে। কারণ ফোনের জায়গায় অন্য কোনো কাজ না থাকলে আবার ফোনের কাছেই ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তাই ঘুমের আগে বিকল্প কিছু অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। যেমন—হালকা বই পড়া, পরদিনের কাজের তালিকা তৈরি করা, ডায়েরিতে দিনের অভিজ্ঞতা লেখা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা অথবা কিছুক্ষণ শান্তভাবে বসে থাকা।
যে কাজটি আপনার কাছে স্বস্তিদায়ক, সেটিকেই রাতের রুটিনের অংশ করা যেতে পারে।
বিছানাকে স্ক্রলিংয়ের জায়গা বানাবেন না
অনেকের অভ্যাস হলো বিছানায় শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন দেখা। এতে বিছানা ধীরে ধীরে ঘুমের জায়গার বদলে বিনোদনের জায়গা হয়ে যায়। ঘুমের সময় বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস তৈরি করলে শরীর ও মন দুটোই বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
তাই সম্ভব হলে ফোনে ভিডিও দেখা বা দীর্ঘ সময় স্ক্রলিংয়ের জন্য বিছানাকে ব্যবহার না করাই ভালো।
ছুটির দিনেও একই নিয়ম
অনেকেই কর্মদিবসে ঘুমের সময় ঠিক রাখলেও ছুটির দিনে গভীর রাত পর্যন্ত ফোন ব্যবহার করেন। এতে ঘুমের রুটিন আবার এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
ছুটির দিনেও মোটামুটি একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার চেষ্টা করলে নিয়মিত রুটিন বজায় রাখা সহজ হয়। তবে ব্যক্তিভেদে ঘুমের প্রয়োজন আলাদা হতে পারে। তাই নিজের বয়স, দৈনন্দিন কাজ ও শারীরিক প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বিনোদন থাকবে, তবে সীমার মধ্যে
মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খারাপ—বিষয়টি এমন নয়। এগুলো আমাদের বিনোদন দেয়, তথ্য দেয়, বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। সমস্যা তৈরি হয় যখন ব্যবহারটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ঘুম, পড়াশোনা, কাজ কিংবা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
তাই রাতের স্ক্রলিং পুরোপুরি বন্ধ করার চেয়ে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা বেশি বাস্তবসম্মত। নিজের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘স্ক্রিন-ফ্রি’ সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে।
দিনের শেষে আমাদের শরীর ও মস্তিষ্ক দুটোরই বিশ্রাম প্রয়োজন। সারাদিনের ব্যস্ততার পর আরও কিছু ভিডিও বা পোস্ট দেখার ইচ্ছা স্বাভাবিক হলেও, প্রতিদিন সেই ইচ্ছার কাছে হার মানলে ঘুমের সময় পিছিয়ে যেতে পারে। তাই ‘আরেকটা ভিডিও’ বলার আগে নিজেকেই প্রশ্ন করা দরকার—এটি কি সত্যিই আরও পাঁচ মিনিট, নাকি ঘুমের আরও এক ঘণ্টা কমে যাওয়ার শুরু?