আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও মানসিক চাপ কেবল আমাদের মানসিক শান্তিই কেড়ে নিচ্ছে না, গোপনে বাড়িয়ে দিচ্ছে হৃদরোগের ঝুঁকিও। অনিয়ন্ত্রিত মানসিক চাপ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস—এই দুটি কারণই মানবদেহে টোটাল কোলেস্টেরল এবং খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) বৃদ্ধির প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ভারতের ন্যাশনাল একাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্সেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, অনিয়ন্ত্রিত মানসিক চাপ বর্তমানে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগে পরিণত হয়েছে, যা সরাসরি হৃদযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলছে।
মানসিক চাপ কি সরাসরি কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে?
হ্যাঁ, খাদ্য বা জীবনযাত্রার প্রভাব ছাড়াই মানসিক চাপ সরাসরি রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। আমরা যখন দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপে ভুগি, তখন শরীরে ‘কর্টিসল’ ও ‘অ্যাড্রেনালিন’ নামক হরমোন নিঃসৃত হয়।
ভারতের ফোর্টিস হাসপাতাল ফরিদাবাদের কার্ডিওলোজি বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. সঞ্জয় কুমার জানান, মানসিক চাপের সময় শরীর ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হয়। এর ফলে লিভার অতিরিক্ত গ্লুকোজ তৈরির পাশাপাশি কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে ধমনীতে রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি করে।
মানসিক চাপ যেভাবে খাদ্যাভ্যাস ও মেটাবলিজম বদলে দেয়
দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ কেবল হরমোনেই প্রভাব ফেলে না, বরং মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসও বদলে দেয়:
ইমোশনাল ইটিং: মানসিক উদ্বেগের সময় মানুষ মিষ্টি, চর্বিজাতীয় ও উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবারের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়।
প্রসেসড ফুড ও অ্যালকোহল গ্রহণ: চটজলদি ক্ষুধা মেটাতে প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং মানসিক চাপ কমাতে অ্যালকোহল পানের প্রবণতা বাড়ে, যা রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দেয়।
অনিয়মিত খাবারের সময়: গভীর রাতে অতিরিক্ত খাওয়া বা অনিয়মিত সময়ে ভোজন মেটাবলিজম নষ্ট করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
আরও পড়ুনআরও পড়ুনওজন কমাতে আমলকী-বিটরুট-গাজরের জুস কতটা কার্যকর?
মানসিক চাপ হৃদযন্ত্রকে প্রভাবিত করার প্রধান লক্ষণসমূহ
১. ঘন ঘন দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ এবং উচ্চ রক্তচাপ।
২. পেটের আশপাশে অতিরিক্ত মেদ জমা ও ওজন বৃদ্ধি।
৩. অনিদ্রা এবং সার্বিক ক্লান্তি অনুভব করা।
৪. সাধারণ শারীরিক পরীক্ষায় কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি আসা।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক উপায় ও খাদ্যতালিকা
মানসিক চাপজনিত কোলেস্টেরল কমাতে চিকিৎসকেরা জীবনযাত্রায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের পরামর্শ দেন:
নিয়মিত ব্যায়াম ও ধ্যান: সপ্তাহে অধিকাংশ দিন ব্যায়াম করা এবং মেডিটেশন স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বর্জনীয় অভ্যাস: ঘুমের মান উন্নত করা এবং ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা।
পুষ্টিকর খাবার: খাদ্যতালিকায় ওটস, বার্লি, শিম ও ডালজাতীয় খাবার, বাদাম, চর্বিযুক্ত মাছ, ফলমূল, বীজ, সবুজ শাকসবজি এবং অলিভ অয়েল অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত কার্যকরী।
উল্লেখ্য, যদি পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকে, কিংবা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে কোলেস্টেরল অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষায় মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস—দুটির ওপরই সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন