নারায়ণগঞ্জে পোশাক শিল্প কারখানার বেহাল দশা: বিপাকে হাজারো শ্রমিক
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। আর এই খাতের অন্যতম প্রধান হাব বা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার কারণে নারায়ণগঞ্জের পোশাক শিল্প কারখানাগুলোতে এক ধরণের স্থবিরতা বা বেহাল দশা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এই শিল্পের সাথে জড়িত হাজার হাজার সাধারণ শ্রমিকের জীবনে।
১। অর্ডারের ঘাটতি ও কারখানা বন্ধের শঙ্কা:
সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, বিসিক শিল্পনগরী, সিদ্ধিরগঞ্জ এবং কাঁচপুর এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতো চেনা ব্যস্ততা নেই অনেক কারখানায়। মালিকপক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া এবং ইউরো-ডলার সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা আগের চেয়ে অর্ডার অনেক কমিয়ে দিয়েছেন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে কাপড়ের দাম মিলছে না। ফলে অনেক ছোট ও মাঝারি মানের কারখানা টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু কারখানা ইতিমধ্যে আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
২। বেতন-ভাতা বকেয়া ও ছাঁটাই আতঙ্ক:
কারখানাগুলোর এই নাজুক পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ পোশাক শ্রমিকেরা। বেশ কিছু কারখানায় নিয়মিত বেতন ও ওভারটাইমের টাকা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিক এলাকার এক নারী শ্রমিক বলেন:
"
মাস শেষ হলেও ঠিকমতো বেতন পাচ্ছি না। ঘর ভাড়া, দোকানের বাকি আর সন্তানের স্কুলের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। তার ওপর যেকোনো সময় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বা চাকরি চলে যাওয়ার আতঙ্কে দিন কাটে।"
অনেক কারখানায় খরচ কমাতে নতুন শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রাখার পাশাপাশি গোপনে ও প্রকাশ্যে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। ফলে হুট করে কাজ হারিয়ে অনেক শ্রমিক পরিবার নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।
৩। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট:
নারায়ণগঞ্জের নিট ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর মতে, এই বেহাল দশার অন্যতম বড় কারণ হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট। কারখানায় পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ডাইং এবং সুতা কাটার মেশিনগুলো সময়মতো চালানো যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি বায়ারদের শিপমেন্ট বা অর্ডার বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পেরে অনেক মালিককে বড় অঙ্কের লোকসান গুণতে হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে শ্রমিকদের বেতন প্রাপ্তিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
৪। উত্তরণের উপায় ও শ্রমিক নেতাদের দাবি:
শ্রমিক অধিকার রক্ষা আন্দোলনের স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মতে, কারখানার সংকট যাই থাকুক না কেন, তার দায় যেন কেবল শ্রমিকদের ওপর না চাপানো হয়। তারা অবিলম্বে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং লে অফ বা ছাঁটাই বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, এই শিল্পকে বাঁচাতে সরকারকে অবিলম্বে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন শিল্প মালিকেরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নারায়ণগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক শিল্পকে দ্রুত টেনে তুলতে না পারলে শুধু হাজারো শ্রমিকই বিপাকে পড়বেন না, বরং পুরো দেশের রপ্তানি আয়ের ওপর এর একটি বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।