রাজশাহী প্রতিনিধি:
একসময় দিন এনে দিন খাওয়া ট্রলি চালক ছিলেন নাসির উদ্দীন নয়ন ওরফে ‘নয়ন ডাঃ’। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তিনি এখন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর এক শীর্ষ মাদক কারবারি, প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও প্রতারকের নাম। প্রশাসনের তথাকথিত ‘সোর্স’ পরিচয়ের আড়ালে অপকর্মের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে তার বিরুদ্ধে। এলাকায় বিলাসী জীবনযাপন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তহবিল তছরুপ এবং সাধারণ মানুষের জমি দখলের অভিযোগে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নয়ন ডাঃ গোদাগাড়ী উপজেলার সহরাগাছি গ্রামের মাজেদ আলী ওরফে ‘ডিসি মাজেদে’র ছেলে। নয়ন মাটিকাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা কেজির পর কেজি (হেরোইন) মাদকের চালানের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক এই নয়ন ডাঃ। নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব মাদকের চালান পৌঁছে দেন তার ভাতিজা বাবু মেম্বার ও ভাগ্নে জসিম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “ভারতে মূল মাদক কারবারিদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ নয়ন ডাঃ-এর। মাদক সরবরাহের সব কাজ ভাতিজা আর ভাগ্নে সামলালেও মূল হোতা নয়ন ডাঃ থাকেন সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে।”
মাদকের অবৈধ টাকায় নয়ন ডাঃ নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সহরাগাছি এলাকায় প্রায় ৬ বিঘা ধানী জমি এবং সর্বশেষ উচলপাড়া এলাকায় নিজ নামে আরও ৩ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন তিনি। হঠাৎ করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া এই সাবেক ট্রলি চালকের বিলাসী জীবনযাপন এখন পুরো এলাকায় আলোচনার প্রধান বিষয়।
রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নয়ন ডাঃ অপকর্মের বিস্তার ঘটান বলে জানা গেছে। সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ফারুক চৌধুরীর আশীর্বাদে তিনি মাটিকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পদ হাতিয়ে নেন। সভাপতি থাকা অবস্থায় বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্টের পাশাপাশি তার নজর পড়ে সাধারণ মানুষের ভিটা-মাটির ওপর। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার উচলপাড়ার বাসিন্দা বিরু নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার বসতভিটা জোড়পূর্বক নিজের দাবি করে দখল করেন নয়ন ডাঃ। পরবর্তী সময়ে নিজের অপকর্মের দাগ ঢাকতে জমিটি ভাগ্নে শীর্ষ মাদক কারবারি জসিমের নামে হস্তান্তর করেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নয়ন ডাঃ-এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মাদকের একাধিক মামলা রয়েছে। গোদাগাড়ী মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে বিগত ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর (মামলা নং-৩, জি আর-৪৮৭) এবং ৬ ডিসেম্বর (মামলা নং-৭, জি আর-৬০৫) দুটি নাশকতার মামলা দায়ের হয়। এছাড়া পার্শ্ববর্তী পবা থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মাদকের মামলা রয়েছে।
একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, নয়ন ডাঃ প্রশাসনের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর "সোর্স" হিসেবে কাজ করার সুবাদে পুলিশি সখ্যতা গড়ে তোলেন। সেই পরিচয়ের দাপট দেখিয়েই তিনি দীর্ঘদিন ধরে অধরা থেকে মাদক কারবার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বললে নয়ন ডাক্তার বলেন,আমি আ'লীগের সময়েই সাংবাদিকদের তোয়াক্কা করিনি। এখনো আপনাকেও বলছি আ'লীগ করি সংবাদের তোয়াক্কা করছি না। যত পারেন লিখেন বড় বড় পত্রিকার সাংবাদিকরা আমাকে ভয় পায়। রাজনৈতিক মামলা দিলে কোনো সমস্যা নাই। মাদক ব্যবসা করি না।
কথা বললে রাজশাহী জেলা পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, তার বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ ছাড় পাবে না। রাজনৈতিক মামলায় সে হয়তো জামিনে আছে, তাই প্রকাশ্যে ঘুরছে।
এ বিষয়ে জানতে গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “অপরাধী যেই হোক না কেন, আইন সবার জন্য সমান। নয়ন ডাঃ-এর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ ও মামলাগুলোর বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।”
অভিযুক্ত নয়ন ডাঃ সহ তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে গোদাগাড়ীকে মাদক ও ভূমিদস্যুমুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগীরা।