সুস্থ থাকার কথা বললেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দামি খাবার, কঠিন ডায়েট চার্ট কিংবা আলাদা কোনো খাদ্যতালিকা। অথচ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের শুরুটা হতে পারে একেবারে নিজের রান্নাঘর থেকেই। প্রতিদিনের পরিচিত খাবারগুলোই যদি একটু পরিকল্পনা করে খাওয়া যায়, তাহলে খাদ্যাভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে বাইরে খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফাস্টফুড, অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার, কোমল পানীয় কিংবা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ হয়ে গেছে। এসব খাবার একেবারে বাদ দেওয়ার চেয়ে কতটা এবং কত ঘন ঘন খাওয়া হচ্ছে, সেদিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই দামি খাবার নয়
স্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—এ জন্য আলাদা বা দামি উপকরণ কিনতে হয়। বাস্তবে আমাদের ঘরের সাধারণ খাবারের মধ্যেই রয়েছে নানা পুষ্টিকর উপাদান।
ভাত, ডাল, শাকসবজি, মাছ, ডিম, দুধ, ফল ও বিভিন্ন ধরনের দেশীয় খাবার সঠিকভাবে মিলিয়ে খেলে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণ করা যায়।
একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মূল কথা হলো বৈচিত্র্য। প্রতিদিন একই ধরনের খাবারের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিমিতভাবে খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।
প্লেটের অর্ধেকটা সবজিতে
খাবারের প্লেট সাজানোর সময় শুধু ভাত বা প্রধান খাবারের দিকে না তাকিয়ে সবজির দিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে। মৌসুমি শাকসবজি সহজলভ্য এবং সাধারণত রান্নাঘরের নিয়মিত খাবারের অংশ।
লাউ, পেঁপে, পটোল, করলা, বেগুন, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালং বা অন্যান্য শাক—নিজের পছন্দ ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া খাবার অনুযায়ী মেনুতে রাখা যায়।
একসঙ্গে অনেক সবজি খাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের খাবারে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের সবজি রাখার অভ্যাস তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
ডালকে অবহেলা নয়
বাংলাদেশের খাবারের তালিকায় ডাল একটি পরিচিত ও সহজলভ্য খাবার। ভাতের সঙ্গে ডাল এবং সবজি—এই সাধারণ খাবারও একটি পুষ্টিকর খাবারের অংশ হতে পারে।
ডালের পাশাপাশি মাছ, ডিম বা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। তবে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
মাছ-ডিম থাকুক নিয়মিত খাবারে
বাংলাদেশে মাছ ও ডিম খুব পরিচিত খাবার। পরিবারের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী এসব খাবার নিয়মিত মেনুতে রাখা যেতে পারে।
মাছ রান্নার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করে ঝোল, ভাপা বা তুলনামূলক কম তেলে রান্নার পদ্ধতি বেছে নেওয়া যেতে পারে। ডিমের ক্ষেত্রেও রান্নার ধরন ও পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া ভালো।
এখানে মূল বিষয় কোনো একটি খাবারকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা নয়। বরং বিভিন্ন ধরনের খাবারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
তেলের ব্যবহার কমানো যায় সহজেই
বাংলাদেশি রান্নায় তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে রান্নায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল ব্যবহারের অভ্যাস থাকলে সেটি ধীরে ধীরে কমানো যেতে পারে।
একদিনেই বড় পরিবর্তন করার দরকার নেই। রান্নার সময় আগের তুলনায় সামান্য কম তেল ব্যবহার করে শুরু করা যায়। ভাজাপোড়া খাবারের পরিবর্তে ঝোল, সিদ্ধ, ভাপা বা কম তেলে রান্না করা খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে প্রতিদিনের খাবারের ক্ষেত্রে রান্নার পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে ভালো অভ্যাস তৈরি করতে পারে।
চিনি ও মিষ্টি খাবারের ব্যাপারে সচেতনতা
চা-কফিতে অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, মিষ্টি, কেক, বিস্কুট কিংবা অন্যান্য মিষ্টি খাবার অনেকের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের অংশ। এগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন না থাকলেও নিয়মিত ও অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস কমানো যেতে পারে।
চায়ে চিনি ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা করা যায়। কোমল পানীয়ের বদলে পানি বা চিনি ছাড়া অন্যান্য পানীয় বেছে নেওয়া যেতে পারে।
মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করলে পরিমাণ ছোট রাখা এবং প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত না করাই ভালো।
পানি পান করার অভ্যাস
অনেকেই ক্ষুধা না লাগলে পানি পান করার কথা ভুলে যান। বিশেষ করে ব্যস্ততার মধ্যে পর্যাপ্ত পানি পান না করার প্রবণতা দেখা যায়।
তাই নিজের সঙ্গে পানির বোতল রাখা যেতে পারে। তবে কতটুকু পানি প্রয়োজন তা ব্যক্তি ও পরিবেশভেদে আলাদা হতে পারে। গরম আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম বা অন্যান্য কারণে পানির প্রয়োজনও পরিবর্তিত হয়।
তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে নিয়মিত পানি পান করার অভ্যাস করা যেতে পারে।
বাইরের খাবার পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে?
বাস্তবে সবসময় ঘরের খাবার খাওয়া সম্ভব নয়। পড়াশোনা, অফিস, ভ্রমণ কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই বাইরে খাওয়াকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং মেনু থেকে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ খাবার বেছে নেওয়া, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলা এবং খাবারের পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।
সপ্তাহে এক-দুবার বাইরে খাওয়া আর প্রতিদিনের খাবারের বড় অংশ বাইরে থেকে খাওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
খাবারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কখন এবং কীভাবে খাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সারাদিন না খেয়ে রাতে একসঙ্গে অনেক খাবার খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।
খাবার খাওয়ার সময় ধীরে খাওয়া এবং পেট ভরে যাওয়ার পরও শুধু অভ্যাসবশত খাবার চালিয়ে না যাওয়ার বিষয়েও সচেতন থাকা যায়।
পড়াশোনা বা কাজের সময় ডেস্কে বসে দ্রুত খাবার খাওয়ার বদলে সম্ভব হলে নির্দিষ্ট সময় নিয়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রেও দরকার ভারসাম্য
পরিবারে শিশু বা কিশোর থাকলে তাদের খাবারের ব্যাপারে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তাদের খাবার নিয়ে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ না করে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে পরিচিত করা ভালো।
শাকসবজি বা ফল পছন্দ না করলে জোর না করে ভিন্নভাবে পরিবেশন করা যেতে পারে। পরিবারের বড়রা স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে শিশুরাও অনেক সময় সেই অভ্যাস অনুসরণ করে।
ডায়েটের নামে না খেয়ে থাকা নয়
স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই কম খাওয়া নয়। বিশেষ করে বয়স ও শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত নানা কঠোর ডায়েট বা দ্রুত ওজন কমানোর পরামর্শ অনুসরণ করার আগে সতর্ক থাকা দরকার।
কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা বা খাদ্যসংক্রান্ত প্রয়োজন থাকলে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
পরিবর্তন শুরু হোক রান্নাঘর থেকেই
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিন নতুন কোনো খাবার কিনতে হবে—এমন ধারণা ভুল। আমাদের পরিচিত খাবারগুলোর মধ্যেই অনেক ভালো বিকল্প রয়েছে।
ভাতের সঙ্গে সবজি ও ডাল, নিয়মিত মাছ বা ডিম, মৌসুমি ফল, পর্যাপ্ত পানি এবং অতিরিক্ত তেল-চিনি-লবণযুক্ত খাবার কমানোর মতো ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়েই শুরু করা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, খাবারকে ভয় না পেয়ে খাবারের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। কারণ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস কোনো কয়েক দিনের ‘ডায়েট’ নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি অভ্যাস।