সারাদিন কাজের মধ্যে হঠাৎ পরিচিত কারও নাম মনে না পড়া, কথা বলার সময় কী বলতে চেয়েছিলেন তা ভুলে যাওয়া কিংবা কোনো কাজে মন বসাতে না পারা—এ ধরনের অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত কাজের পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারের ধরনও এসব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ মস্তিষ্ক সারাক্ষণ কাজ করার জন্য গ্লুকোজ, প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানসহ নানা পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কী থাকছে, তার প্রভাব মস্তিষ্কের শক্তি, বিপাকীয় স্বাস্থ্য ও রক্তনালীর স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে।
অনেকে ভুলে যাওয়া, মনোযোগের ঘাটতি, মানসিক ক্লান্তি বা দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঝিমুনিকে ‘ব্রেইন ফগ’ বলেন। তবে ব্রেইন ফগ কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। যশোদা মেডি সিটির নিউরোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. লাভ বানসাল বলেন, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য নিরবচ্ছিন্ন শক্তি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি দরকার। তাই স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের বিষয়টি বিবেচনায় খাদ্যাভ্যাসকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত খাবারের প্রভাব
ঘন ঘন অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করাজাতীয় খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রায় দ্রুত ওঠানামা হয়। এর পর শরীরে হঠাৎ শক্তির ঘাটতি দেখা দিয়ে ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যা তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় কাজ বা পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে খাবার বাদ দেওয়া মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন করে দেয়।
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান
প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত লবণ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস শরীরের বিপাকীয় ও রক্তনালীর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব শারীরিক অবস্থাও পরোক্ষভাবে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, পূর্ণশস্য, বাদাম, বীজ ও মাছ থেকে ফাইবার, ভিটামিন, খনিজ এবং স্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট পাওয়া যায়। এসব খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
একটি খাবার নয়, পুরো খাদ্যতালিকাই গুরুত্বপূর্ণ
স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য কোনো একটি খাবারকে ‘ব্রেইন ফুড’ হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ডা. বানসালের মতে, সারাদিনে কেউ ব্লুবেরি বা আখরোট খেলেন কি না, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা সামগ্রিকভাবে কতটা স্বাস্থ্যকর। অর্থাৎ শুধু একটি বিশেষ খাবার যোগ করলেই স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগের সমস্যা দূর হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। নিয়মিত সুষম খাবার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণশস্য, বাদাম ও বীজ রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভিটামিন ও আয়রনের ঘাটতিও কারণ
খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থাকলেও মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভিটামিন বি-১২ ও ফোলেটের ঘাটতির সঙ্গে স্নায়বিক ও জ্ঞানীয় সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। আয়রনের ঘাটতিতেও ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া ও স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে। শার্ডাকেয়ার-হেলথসিটির ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের সিনিয়র ডিরেক্টর ও প্রধান ডা. আতামপ্রীত সিং বলেন, ভিটামিন বি-১২, ফোলেট ও আয়রনের ঘাটতি অনেক সময় মানুষ যে লক্ষণকে ‘ব্রেইন ফগ’ বলে থাকেন, তার কারণ হয়। বিশেষ করে খুব সীমিত খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা বা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না খাওয়ার ক্ষেত্রে এমন সমস্যা দেখা যায়। তবে শরীরে ঘাটতি না থাকলে নিজের ইচ্ছায় ভিটামিন বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শের মাধ্যমে ঘাটতি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি
মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য শুধু খাবার নয়, পর্যাপ্ত পানিও প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় কাজ করার সময় বা গরম আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত তরল না খেলে সতর্কতা ও মনোযোগ কমে যায়। ডা. আতামপ্রীত সিং বলেন, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ না করলে বিশেষ করে দীর্ঘ সময় কাজের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও মনোযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই সারাদিন নিয়মিত পানি ও প্রয়োজনীয় তরল পান করার অভ্যাস রাখা জরুরি।
ঘুম ও মানসিক চাপও মাথায় রাখুন
স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগের সমস্যা হলেই শুধু খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করা ঠিক নয়। অপর্যাপ্ত ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তাল্পতা এবং কিছু ওষুধের কারণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। ডা. সিং বলেন, দীর্ঘস্থায়ী ব্রেইন ফগের পেছনে এসব কারণ থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এর সঙ্গে কোনো শারীরিক বা স্নায়বিক সমস্যা যুক্ত আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।
প্রতিদিনের খাবারে যা রাখবেন
মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য আলাদা কোনো ‘ব্রেইন ফগ ডায়েট’ নেই। বরং প্রতিদিনের খাবারে বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শাকসবজি ও ফলমূলের পাশাপাশি পূর্ণশস্য ও ডালজাতীয় খাবার রাখুন। প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, মাছ বা ব্যক্তির উপযোগী অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেছে নিন। বাদাম ও বীজ থেকেও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়।অন্যদিকে চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস ও পরিশোধিত খাবার কমানো ভালো। প্রতিটি বেলার খাবারে পুষ্টির ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করলে শরীর ও মস্তিষ্ক দুটিরই প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা সহজ হয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
মাঝেমধ্যে ভুলে যাওয়া বা কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া সবসময় বড় কোনো সমস্যার লক্ষণ নয়। তবে স্মৃতিশক্তির সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে বা দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ডা. লাভ বানসাল বলেন, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিন থাকলে এবং এর সঙ্গে ভাষা, চলাফেরা বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ তখন শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, অন্য কোনো শারীরিক বা স্নায়বিক কারণও খুঁজে দেখা দরকার।