ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক বক্তব্য চলাকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদারের হাততালি দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর সরকারি কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন ওই কর্মকর্তা।
সম্প্রতি পীরগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর সেনগাঁও ইউনিয়নের একটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যান ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান। সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সময় আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে বর্তমান চেয়ারম্যান সাইদুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে রাখার কথা উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে উপস্থিত লোকজনকে তাঁকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান।
এ সময় সংসদ সদস্যের পাশে বসা ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারকে বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে হাততালি দিতে দেখা যায়। বিশেষ করে নির্বাচনে একজন নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আহ্বানের পর তাঁর করতালি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সরকারি দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন আচরণ কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদার সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনে বলেন, ‘তাহলে লিখে দেন, এমপির সঙ্গে ইউএনও নির্বাচনী প্রচারণায়।’ এরপর তিনি ইংরেজিতে বলেন, ‘ইউএনও হচ্ছে নাও ওয়ান অব দ্য বিএনপি লিডারস অব পীরগঞ্জ।’ তাঁর এই বক্তব্যও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউএনও আরও বলেন, যে সরকার ক্ষমতায় থাকত, তিনি সেই দলেরই নেতা। তাঁর ভাষ্য, তাঁর দল হচ্ছে সরকারি দল এবং তাঁর আদর্শও সরকারি দলের আদর্শ। এ সময় তিনি বক্তব্যের একটি অংশ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কথা বলেন এবং নিজেকে সারা দেশে ভাইরাল করার ইচ্ছার কথাও উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রসঙ্গে ইউএনও দাবি করেন, বিভিন্ন বিষয়ে সংসদ সদস্যকে জিজ্ঞেস করে কাজ করতে হয়। এ-সংক্রান্ত চিঠি তাঁর কাছে রয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে ওই চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণের সমালোচনা করেছেন রাজনৈতিক নেতারাও। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ঠাকুরগাঁও জেলা সাধারণ সম্পাদক আবু সায়েম বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রকাশ্যে হাততালি দিতে পারেন, তা বোধগম্য নয়।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্য যখন আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একজনকে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিচ্ছেন, তখন ইউএনওর সবার আগে হাততালি দিয়ে সমর্থন জানানোর বিষয়টি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দূরে থাকা জরুরি। বিশেষ করে নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা জনসাধারণের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা যদি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্যে করতালি দিয়ে সমর্থন জানান, তাহলে ভবিষ্যৎ নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আরেকজন লিখেছেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে এমন বিতর্ক তৈরি হলে সাধারণ মানুষের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে।
তবে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভিডিওটি ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, পেশাদারত্ব ও জনআস্থা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পীরগঞ্জের এই ঘটনা সেই দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।