রেমিট্যান্স বাড়লেও মূল্য হারাচ্ছে টাকা
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও প্রবাসী আয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৬ কোটি ডলার। আগের মাস বা আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় যা বেশি। এর আগের দুই অর্থবছরে রেকর্ড রেমিট্যান্স এসেছিল। তবে জ্বালানি, সারসহ কিছু পণ্য আমদানিতে খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ায় ডলারের দর বাড়ছে। আন্তঃব্যাংকেই প্রতি ডলার এখন ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা দরে বিক্রি হচ্ছে। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে যা ১২২ টাকার ঘরে ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৬৪২ কোটি ডলার বা ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। রেমিট্যান্স এভাবে বাড়লেও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্য উৎসে ভালো অবস্থান নেই। যে কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দর কিছুটা বেড়ে রোববার আন্তঃব্যাংকে ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় উঠেছে। গত মাসের একই দিন যা ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। এভাবে ডলারের দর বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ আরও বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৭৭৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৩৭৬ কোটি ডলার বা ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। অথচ একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ৮৩ কোটি ডলার বা ২ দশমিক শুন্য ৮ শতাংশ। যে কারণে ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তঃব্যাংকের পাশাপাশি আমদানি, রপ্তানি ও বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স কেনায় এখন বেশি খরচ হচ্ছে। অবশ্য ডলারের ওপর বাড়তি চাপের সুযোগ নিয়ে কোনো ব্যাংক যেন কেবল বাড়তি লাভের জন্য ডলারের দর বাড়াতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। রোববারও কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ডলারের ওপর চাপ তৈরির প্রধান কারণ জ্বালানি ও সার আমদানিতে খরচ অনেক বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সব মিলিয়ে আমদানি খরচ বেড়েছে মাত্র ৩৭৬ কোটি ডলার। যেখানে শুধু পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৯০৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে ব্যয় হয়েছিলো ৪৮৮ কোটি ডলার। এর মানে শুধু এই পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৪১৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার বা ৮৫ দশমিক ২২ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সার আমদানিতে ৪৩ দশমিক ৩০ শতাংশ বা ১০৯ কোটি ডলার ব্যয় বেড়েছে। অবশ্য ভোগ্য পণ্য, মধ্যবর্তী বিভিন্ন পণ্য ও তৈরি পোশাকের কাঁচামাল আমদানিতে খরচ অনেক কমেছে। তা না হলে ডলার বাজারে আরও চাপ তৈরি হতো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পরিশোধের ব্যাপক চাপের মধ্যেও জুলাই শেষে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ রয়েছে ৩১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় গ্রস রিজার্ভ ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন এবং বিপিএম৬ অনুযায়ী ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রথমবারের মতো ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। তবে ওই সময় বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়া, প্রবাসী আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ হুন্ডিতে আসাসহ বিভিন্ন কারণে ডলারের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। চাপ সামলাতে রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে ধারাবাহিকভাবে রিজার্ভ কমে যায়। এরপরও ওই সময়ের ৮৪টাকা দরের ডলার উঠে যায় ১২০টাকায়। অনেক দিন ধরে স্থিতিশীল থাকার পর এখন আবার বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, জ্বালানি, সারসহ কিছু আমদানির দায় পরিশোধ করতে গিয়ে ডলারে বাজারে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এ চাপ সাময়িক। অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি অব্যাহত থাকায় এখন হুন্ডির সুযোগ কমেছে। যে কারণে এতো কিছুর পরও বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ছে।