ঢাকা    সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুড়িগঙ্গা

অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলে গ্রাহকদের ক্ষোভ

জুন মাসের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জের ডিপিডিসির গ্রাহকরা। যা স্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের তুলনায় আড়াইগুণ পর্যন্ত বেশি। গ্রাহকদের অভিযোগ, মে মাসের ৫ দিনের বিল জুন মাসে হিসাব করে বেশি বিলের স্লটে উন্নীত করে গ্রাহকদের কাছ থেকে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ডিপিডিসি। আগের দুই বছরও জুন মাসে একই ধরনের হয়রানি করেছে বলে গ্রাহকদের অভিযোগ। নগরীর আমলাপাড়ার বাসিন্দা মিঠু ভূঁইয়া। স্ত্রী ও তিন মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে যেসব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থাকে তা তাঁর আছে। বাড়তি আছে এসি। স্বাভাবিক সময় তাঁর বিল আসে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এ বছরের মে মাসেও তাঁর বিল এসেছে ছয় হাজার ১০০ টাকা। কিন্তু জুন মাসে বিল লাফ দিয়েছে। জুন মাসের বিল হাতে পেয়েছেন জুলাই মাসে। ১১ হাজার ২০০ টাকা বিল এসেছে। তাঁর বিল বেড়েছে প্রায় ৮৭ শতাংশ। মে মাসের তুলনায় বিদ্যুৎ বিল শুধু বাড়েনি অনেকের ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ হয়েছে। নগরীর বাবুরাইলের বাসিন্দা শহীদ উল্লাহ শিমুল জানান, তাঁর বাসায় এসি নেই। স্বাভাবিক সময়ে বিল আসে দুই হাজার টাকার মতো। মে মাসে এসেছিল দুই হাজার ৩০০ টাকা। কিন্তু জুন মাসের বিল এসেছে চার হাজার ৫০০ টাকা। তাঁর বিল বেড়েছে ১২৫ শতাংশ। ডিপিডিসির আরেক গ্রাহক আরিফ ইশতিয়াক আদনান জানান, তার ভাড়াটিয়া স্বল্প আয়ের মানুষ। দুই কক্ষের বাসা নিয়ে থাকেন। তাঁর দুটি ফ্যান, একটি ফ্রিজ, চারটি লাইট চলে। মে মাসে বিল এসেছিল ৮০০ টাকা। জুন মাসে এসেছে এক হাজার ৭০০ টাকা। তাঁর বিল বেড়েছে ১১২ দশমিক ৫ শতাংশ। এই বিল পেয়ে তিনি দিশেহারা। বিদ্যুৎ বিল দিতে গিয়ে তাঁর বাজার খরচে টান পড়েছে। নগরীর পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, তাঁর বিল স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি এসেছে। সাধারণত আড়াই হাজার থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকা বিল আসে। জুন মাসের বিল দিয়েছে ছয় হাজার ৮৭০ টাকার। এক মাসের ব্যবধানে তাঁর বিল বেড়েছে ১৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ। শুধু আবাসিক গ্রাহকদেরই নয়, বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও এই অস্বাভাবিক বিল দেওয়া হয়েছে। নগরীর বালুর মাঠ এলাকার সিন্যামন রেস্টুরেন্টের মালিক শাকিল সারোয়ার জানান, তাঁর রেস্টুরেন্টে মে মাসে বিল এসেছিল এক লাখ ৩৯ হাজার টাকা। এটিও তাঁর কাছে বেশি মনে হয়। তবে জুন মাসের বিল দিয়েছে এক লাখ ৯৮ হাজার ৭০০ টাকা। যা একেবারেই অস্বাভাবিক।  আড়াইহাজারের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, জুন মাসে মে মাসের তুলনায় বেশি লোডশেডিং হয়েছে। অথচ মে মাসের তুলনায় জুন মাসে বিল বেশি এসেছে এটা কীভাবে সম্ভব?  মে মাসের পাঁচ দিনের বিল জুন মাসের সঙ্গে হিসাব করা হয়েছে। এভাবে গ্রাহকদের বেশি বিলের স্লটে উন্নীত করে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ডিপিডিসি। এমন অভিযোগ করলেন নগরীর আল্লামা ইকবাল রোডের বাসিন্দা এজাজ কোরেশি। ২০২৬ সালে গৃহস্থালি পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিল ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। যা ১ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। বিদ্যুতের ৬টি স্লট রয়েছে। প্রথম স্লট শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট। এই স্লটে রেট ইউনিটপ্রতি পাঁচ টাকা ২৬ পয়সা। দ্বিতীয় স্লট ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট। এর রেট সাত টাকা ২০ পয়সা। তৃতীয় স্লট ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট। এর রেট সাত টাকা ৫৯ পয়সা। চতুর্থ স্লট ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট, পঞ্চম স্লট ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট, ষষ্ঠ স্লট ৬০০ ইউনিটের বেশি। প্রথম স্লটে যেখানে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্য পাঁচ টাকা ২৬ পয়সা, সেখানে ষষ্ঠ ধাপে ইউনিটপ্রতি মূল্য ১৪ টাকা ৬১ পয়সা। অতিরিক্ত বিল ও প্রি-পেইড মিটারের বিরোধিতা করে নারায়ণগঞ্জে ধারাবাহিক আন্দোলন করছে ‘নাগরিক অধিকার ফোরাম’। এর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল জানান, সরকার গৃহস্থালি পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিল ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়িয়েছে। বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ বিল ১৮ দশমিক ০৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু গ্রাহকদের যে বিল এসেছে সেটি হিসাব করে দেখেন, বিদ্যুৎ বিল বেশি এসেছে ৪৫ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত। বাকি বিল কেন বেশি এলো? তার অভিযোগ, ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও জুন মাসের বিল একই পদ্ধতিতে বেশি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) আর নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) এই দেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমিকা নিয়েছে। তারা জনগণের রক্ত চুষে নিচ্ছে। গণআন্দোলন ছাড়া এই রক্তচোষা চক্রকে থামানো যাবে না। তবে কারচুপি করে বিদ্যুৎ বিল বাড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিপিডিসির নারায়ণগঞ্জের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তাঁর ভাষ্য, জুন মাসে গরম বেশি ছিল। এ জন্য গ্রাহকরা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এই দুটি বিষয় মিলিয়ে বিল বেশি এসেছে। কারও অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ থাকলে তাদের কাছে নিয়ে যেতে বলেন তিনি।

অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলে গ্রাহকদের ক্ষোভ