ঢাকা    শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুড়িগঙ্গা

১০৬ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ঐতিহ্য, আন্দোলন, অর্জন ও নতুন স্বপ্নের পথচলা

১৯২১ সালের ১ জুলাই পূর্ববঙ্গের জনগণের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার শুরুতে তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক এবং ৮৪৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও আজ এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ১৩টি অনুষদ, ৮৪টি বিভাগ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, ৫৭টি গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র, ১৯টি আবাসিক হল এবং ৪টি হোস্টেল। এখানে ৩৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। শিক্ষক রয়েছেন দুই হাজারের বেশি, কর্মকর্তা এক হাজারের বেশি এবং কর্মচারী প্রায় তিন হাজার।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও কোটা সংস্কার আন্দোলন—প্রতিটি সংগ্রামেই বিশ্ববিদ্যালয়টি নেতৃত্ব, সাহস ও প্রেরণার প্রতীক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।তবে অর্জনের পাশাপাশি নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আবাসন সংকট, বাজেট ঘাটতি, গবেষণায় সীমিত বরাদ্দ, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়কে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩৩ কোটি ২১ লাখ টাকা, যার মধ্যে গবেষণা খাতে বরাদ্দ মাত্র ২১ কোটি টাকা।এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অগ্রগতি ধরে রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সম্প্রতি প্রকাশিত কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং ২০২৭-এ তৃতীয়বারের মতো বিশ্বের সেরা ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ১২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে ২০ বছর মেয়াদি ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি একাডেমিক প্ল্যান (ডিইউএপি) ২০২৬–২০৪৬’, যার লক্ষ্য শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা।এ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। দিবসটি উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ এবং বিভিন্ন অনুষদের উদ্যোগে নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। আমরা চাই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিবেশ আরও শক্তিশালী হোক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে পারাটা গর্বের। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস আমাদের শুধু পড়াশোনা নয়, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধও শেখায়।ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনিয়া আক্তার বললেন, “বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে ক্যাম্পাসের প্রাণচাঞ্চল্য সত্যিই দারুণ লাগে। তবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রম আরও সমৃদ্ধ হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস আমাদের অনুপ্রাণিত করে। নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব হবে এই ঐতিহ্য ধরে রেখে জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধকে আরও এগিয়ে নেওয়া।”বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আশা করছে, শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাতারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে। ১০৬ বছরের গৌরবময় এই পথচলা ভবিষ্যতেও দেশের জ্ঞানচর্চা, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে অব্যাহত থাকবে।

১০৬ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ঐতিহ্য, আন্দোলন, অর্জন ও নতুন স্বপ্নের পথচলা