শ্রেণিকক্ষে নেই শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় চলাকালেই কোচিং
সকালে ঘণ্টা বাজছে বিদ্যালয়ে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের গন্তব্য শ্রেণিকক্ষ নয়, কোচিং সেন্টার। কোথাও পুরো সপ্তাহ কেটে যাচ্ছে একজন শিক্ষার্থীরও দেখা না মিলেই। কোথাও আবার টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই অর্ধেক শ্রেণিকক্ষ খালি হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন, ভবন আছে, শ্রেণিকক্ষ আছে, নেই শিক্ষার্থী। অন্যদিকে একই সময়ে কোচিং সেন্টারগুলোতে উপচে পড়া ভিড়।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার এমনই এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সরেজমিন অনুসন্ধানে।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে মানসম্মত পাঠদান না হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে কোচিংনির্ভর হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে শিক্ষকদের দাবি, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে না আসায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চারঘাটে ৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ছাড়া ৫৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৭টি মাদ্রাসা ও ১৭টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানসহ মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট ৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। অধিকাংশ বিদ্যালয়েই উপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে কম।
তিন দিন গিয়েও মেলেনি শিক্ষার্থী
উপজেলার জয়পুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। সেখানে মোট শিক্ষার্থী ১২৭ জন। অথচ সপ্তাহে তিন দিন সরেজমিনে গিয়েও একজন শিক্ষার্থীর দেখা মেলেনি। বিদ্যালয়ে কয়েকজন শিক্ষককে বসে গল্প করতে দেখা গেছে।
জয়পুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘কেউ বাড়িতে পড়ছে, কেউ নানির বাড়িতে বেড়াতে গেছে। এজন্য শিক্ষার্থীরা আসেনি।’
একই চিত্র হুজারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী উপস্থিত পাওয়া গেছে। পাঁচটি ভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীকে একই কক্ষে পাঠ নিতে দেখা গেছে।
প্রধান শিক্ষক মো. রমজান আলী বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। অভিভাবকদের বলেও খুব একটা লাভ হচ্ছে না। যারা আসছে তাদের ঠিকমতো ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।’
টিফিন মানেই কোচিংয়ে দৌড়
উপজেলা সদরের চারঘাট পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ৭৭ জন। কিন্তু নিয়মিত আসে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ জন। উপস্থিতদেরও অর্ধেকের বেশি টিফিনের সময় বিদ্যালয় ছেড়ে কোচিংয়ে চলে যায়।
প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক বুঝিয়েও লাভ হচ্ছে না। কেউ বিদ্যালয়ে আসে না, আবার যারা আসে তারাও টিফিনে ফাঁকি দিয়ে কোচিংয়ে চলে যায়। আমরা শিক্ষকরা ব্যাপক বেকায়দায় আছি। বিষয়টি উপজেলা মাসিক সভাতেও জানিয়েছি।’
উপজেলা সদরের চারঘাট বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৮ জন। এর মধ্যে উপস্থিত থাকে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন।
প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মেধাবী শিক্ষার্থীরাই স্কুল বাদ দিয়ে কোচিং করে। আমরা কোনোভাবেই তাদের স্কুলমুখী করতে পারছি না। আবার স্কুল টাইমেও কোচিং চলে। সেটিও নিষেধ করে বন্ধ করা যাচ্ছে না।’
কোচিংয়ের জন্য আগেই ছুটি
মেরামতপুর গ্রামের ভ্যানচালক সেলিম রেজা জানান, তাঁর ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সহপাঠীদের অনেকে বৃত্তির কোচিং করছে। কোচিংয়ে মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ্য তাঁর নেই। কিন্তু কোচিংয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য পুরো ক্লাসই আগেই ছুটি হয়ে যায়। এতে তাঁর মতো গরিবের সন্তানরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কোচিংয়ের জন্য আগেভাগেই ছুটি দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে পিরোজপুর (২) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূর উদ্দিন শেখ বলেন, ‘তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ক্লাস বিকেল ৪টা পর্যন্ত হয়। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণিকে বিকেল ৩টার মধ্যেই ছুটি দিতে বাধ্য হই। কারণ তখন তাদের কোচিং থাকে। ৩টা না বাজতেই তারা কোচিং-এ যাবার জন্য চাপ শুরু করে।’
স্কুল চলাকালেই জমজমাট কোচিং
সরেজমিনে উপজেলার সাফল্য কোচিং সেন্টারে দেখা যায়, বিদ্যালয় চলার সময়েই পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্লাস চলছে। সেখানে স্কুল ফাঁকি দিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ে। শুধু উপজেলা সদর নয়, বিভিন্ন ইউনিয়নের কোচিং সেন্টারেও একই চিত্র।
কোচিংয়ে আসা দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তারিন মাহমুদা বলে, ‘বিদ্যালয়ে বাংলা কিংবা ইসলাম শিক্ষার মতো ক্লাস বেশি হয়। বিজ্ঞান বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস নিয়মিত হয় না। তাই কোচিং ছাড়া উপায় নেই।’
সাফল্য কোচিং সেন্টারের পরিচালক রবিন মাহমুদ বলেন, ‘স্কুলের আগে খুব সকালে কিংবা শেষের পরে সন্ধ্যায় কেউ কোচিং করতে চায় না। অভিভাবকরাই এই সময় নির্ধারণ করেছেন। এজন্য শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা ভেবেই ক্লাস নিতে হচ্ছে।’
নীতিমালা কাগজে, বাস্তবে উল্টো চিত্র
কোচিং-সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১২ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলার সময়ে কোচিং পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ বিধান লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট কোচিং সেন্টারের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু চারঘাটে দিনের পর দিন বিদ্যালয় চলার সময়েই কোচিং সেন্টার চালু থাকলেও কার্যকর নজরদারি নেই।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, ‘যাদের টাকা আছে তারা কোচিং করছে। কিন্তু গরিব পরিবারের সন্তানরা পিছিয়ে পড়ছে। কিছু শিক্ষার্থী কোচিংয়ে চলে যাওয়ায় শ্রেণিকক্ষেও ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে না। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য বাড়ছে এবং শিক্ষকরা ফাঁকি দেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন।’
উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার রাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘পরিদর্শনে গিয়ে সমস্যাগুলো আমরাও দেখেছি। শিক্ষকদের নিয়ে সভা হয়েছে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত ও স্কুল চলাকালীন কোচিং বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সমাবেশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা সেখানে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন করছি। একই সঙ্গে নীতিমালা অনুযায়ী কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’