সড়কের মৃত্যু কি শুধু নিছক দুর্ঘটনা নাকি অবকাঠামোগত হত্যাকাণ্ড?
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এটি অবকাঠামোগত হত্যাকাণ্ড—এই প্রশ্ন আমাদের সবার মনে জাগা উচিত। প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা এটিকে শুধু ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’ হিসেবে দেখছি। সড়কে মৃত্যু মানেই শুধু চালকের ভুল নয়, এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা, যেখানে অবকাঠামোর ত্রুটি, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং অব্যবস্থাপনাই প্রধান কারণ। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৫,০০০+ মানুষের মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮,০০০+ মানুষ নিহত, আহত হয়েছে প্রায় ১২,০০০+ প্রতিদিন গড়ে ২০+ প্রাণহানি ঘটছে, যা যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ!মূল কারণগুলো কী?★ ফিটনেসবিহীন যানবাহন★ দক্ষ চালকের অভাব★দুর্বল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা★ অবকাঠামোগত ত্রুটি (ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, অপরিকল্পিত স্পিড ব্রেকার, সংকীর্ণ ফুটপাথ, প্রয়োজনীয় ওভারব্রিজের অভাব)দুর্ঘটনা না হত্যাকাণ্ড? (Accident or Structural Homicide?)অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে প্রাণহানি:বাংলাদেশের বেশিরভাগ মহাসড়কে ফুটওভার ব্রিজ নেই, সিগন্যালিং ব্যবস্থা অকার্যকর। স্কুল, কলেজ, বাজার সংলগ্ন এলাকায় সড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। অপ্রশস্ত রাস্তা, যেখানে দৈনিক হাজারো যানবাহন চলে, কিন্তু কোনও সুনির্দিষ্ট লেন ম্যানেজমেন্ট নেই। কিছু রাস্তার ডিজাইনই বিপজ্জনক, যেমন—ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে এক্সিটের অভাব, মহাসড়কে বিপজ্জনক বাঁক। এছাড়াও ঢাকা—ময়মনসিংহ মহাসড়কে অপরিকল্পিত লেন।আইন প্রয়োগের দুর্বলতা:লাইসেন্সবিহীন চালকরা অনায়াসে গাড়ি চালাচ্ছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি কীভাবে রাস্তায় চলাচল করছে? সরকারি যানবাহনের ক্ষেত্রেও নিয়মের তোয়াক্কা করা হয় না। এগুলোর ফলে যে মৃত্যুগুলো ঘটছে, তা নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে সংগঠিত হত্যাকাণ্ড।করণীয় ও সমাধান (Solutions & Recommendations১. সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন:ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়ক চিহ্নিত করে অবিলম্বে সংস্কার করা।ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ও জেব্রা ক্রসিং স্থাপন বাধ্যতামূলক করা।সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্পিড লিমিটার ও ডিজিটাল সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করা।২. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা: ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই।৩. আইনি সংস্কার:"সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮" পুরোপুরি কার্যকর করতে হবে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।৪. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি:স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। সাধারণ জনগণকে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে আরও সচেতন করা।সড়কে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া প্রাণহানি শুধুমাত্র দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি অবকাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। যদি আমরা অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ না নেই, তবে এই মৃত্যুর মিছিল কখনোই থামবে না। আমরা চাই, নিরাপদ সড়কের জন্য শুধু আন্দোলনই নয়, কার্যকর পরিবর্তন। সরকার, প্রশাসন, পরিবহন মালিক, চালক ও জনগণ সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। "নিরাপদ সড়ক আমাদের অধিকার, এটি কোনো অনুকল্পনা নয়!"