মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রভাব থেকে কোনোভাবেই নিজেদের দূরে রাখতে পারছে না সৌদি আরব। সংঘাত শুরুর পর থেকেই রিয়াদ সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো এড়াতে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা হুমকি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা দেশটিকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রিয়াদের দাবি, এসব গোষ্ঠীর ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ফলে সৌদি আরবের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—তারা কি কঠোর সামরিক অবস্থান বজায় রাখবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের পথ খুঁজবে।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী বলয়। একদিকে ইরান, তাদের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং ইয়েমেনের হুথি ও ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং তাদের মিত্র উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও জর্ডান। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও এই সংঘাতের সব পর্যায়ে তাদের ভূমিকা সমানভাবে দৃশ্যমান নয়।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা সংকট নতুন নয়। ২০১৯ সালে আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলায় দেশটির জ্বালানি খাত বড় ধাক্কা খায়। ওই হামলার ফলে সৌদি আরবের দৈনিক তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লে সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু টার্মিনাল ব্যবহার করে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ সচল রাখার চেষ্টা করে। তবে ইয়েমেনকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর হুথিদের হামলার ঝুঁকিও বেড়েছে। ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়েও তেল পরিবহন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালিয়েও হুথিদের পুরোপুরি দমন করতে পারেনি সৌদি আরব। বরং ২০২২ সালে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। কিন্তু বর্তমানে উত্তরে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং দক্ষিণে হুথিদের উপস্থিতি রিয়াদকে নতুন নিরাপত্তা সংকটে ফেলেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা সৌদি আরব এখন গুরুত্বপূর্ণ এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। দেশটি কি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সামরিক অবস্থান নেবে, নাকি কূটনীতি ও সমঝোতার মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।