ঢাকা    সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বুড়িগঙ্গা

বাঙ্গালা সাহিত্যের আধুনিকতার ইতিকথা



বাঙ্গালা সাহিত্যের আধুনিকতার ইতিকথা

একটি ভাষার রুপ ও পরিচয়ের প্রধান দর্পন হচ্ছে সেই ভাষায় রচিত সাহিত্য। সাহিত্য শুধুমাত্র ভাষারই দর্পন নয়, সেই ভাষাভাষী সকল মানুষ তথা সমগ্র জাতির দর্পনস্বরুপ।আমরা বাঙালী জাতি। আমাদের ভাষা বাংলা।এই বাংলা ভাষারও রয়েছে এক রত্নখচিত দর্পন,যা আমাদের বাংলা সাহিত্য। এর শুরুটা কিন্তু নতুন নয়। এর ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। 

প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে অন্ধকার যুগ,মধ্যযুগ পেরিয়ে এসেও এর ধারা প্রবাহমান চলছে। চর্যাপদের মাধ্যমেই এর সূচনা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কারণ চর্যাপদের আগের কোনো নিদর্শন বাংলা সাহিত্যে পাওয়া যায়নি। এর রচনাকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও মধ্যযুগের বহু আগেই বৌদ্ধ ভিক্ষু কবিদের দ্বারা যে চর্যাপদ রচিত হয়েছিল তাতে কোনো দ্বিমত নেই। হারানো এই নিদর্শন ১৯০৭ সালে উদ্ধার করা হয়েছে, তা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য এক পরম পাওয়া।যা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছে।চর্যাপদ যদি উদ্ধার না হতো তাহলে বাংলা সাহিত্যের যে হাজার বছরের পুরাতন ইতিহাস রয়েছে তা অজানা-ই থেকে যেত। চর্যার যুগের পরের সময়কে (১২০০-১৩৫০ সাল পর্যন্ত) বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলা হয় কারণ, সেসময়ের রচিত বাংলা সাহিত্যের কোনো উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায়নি। এরপর মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যায়। শাহ মুহম্মদ সগীর,সৈয়দ আলাওল, দৌলত কাজী,আব্দুল হাকীম প্রমুখ কবিরা এবং শ্রীচৈতন্যযুগের সাহিত্যিকদের দ্বারা  অসংখ্য সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছিল যা এখনো সংরক্ষিত আছে। এছাড়া মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গলের মতো বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যগুলোও মধযুগীয় বাংলা সাহিত্যের নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম। 

বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার বহু প্রাচীন ইতিহাস ও নিদর্শন থাকলেও তার বিকাশ ও পূর্ণতা লাভ করতে বহু সময় লাগে। প্রাচীন যুগের চর্যাপদ কিংবা অন্ধকারোত্তর যুগ তথা মধ্যযুগে সাহিত্য রচনা হলেও তাতে তেমন আধুনিকত্ব ছিল না বললেই চলে। বর্তমানে আধুনিক যুগে এই প্রজন্মের কেউ সাহিত্য বললেই তার চোখে ভেসে ওঠে কবিতা,গল্প,উপন্যাস,নাটক ইত্যাদি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের আগে কবিতা বাদ দিলে বাকি সাহিত্যগুলো ছিল তো দূরের কথা, ছিল না তেমন কোনো উন্নতমানের কাব্য। বাংলা ভাষায় প্রথম মহাকাব্যটিই রচিত হয় বাংলা কাব্যে আধুনিকতার প্রবর্তক, বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের রুপকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের মাধ্যমে। বর্তমানে কাব্যগ্রন্থ বলতে যে কবিতার বই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, বাংলা সাহিত্যে সেই প্রথম আধুনা কাব্যগ্রন্থটিই হচ্ছে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'পদ্মিনী উপাখ্যান’ যা প্রকাশ হয় ১৮৫৮ সালে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যসমূহের মধ্যে অধিকাংশই ধর্মকেন্দ্রিক, কাহিনীকাব্য,রোমান্টিক উপাখ্যানকাব্য ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মঙ্গলকাব্যগুলো বিভিন্ন হিন্দু দেব-দেবীদের কাহিনী নিয়ে লেখা হতো,মৈমনসিংহ-গীতিকায় উল্লেখিত কাহিনীকাব্যগুলো যেমন - মহুয়ার পালা,দিওয়ানে মদিনা ইত্যাদি কিংবা শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘'ইউসূফ-জোলেখা’’ ইত্যাদি ছিল বিভিন্ন প্রেমকাহিনী নিয়ে রচিত। মূলত বাংলা সাহিত্য বিকাশ ও পূর্ণতা লাভের সূচনা শুরু হয় আধুনিক যুগে তথা উনিশ শতকের মাঝামাঝি ও তার পর থেকে।

ব্রিটিশ শাসন স্থায়ী হওয়ার পর যখন বাংলার নব্য বাবুসমাজ ও শিক্ষিত যুবসমাজ ব্যস্ত হয়ে পড়ে অন্ধ ইংরেজ অনুকরণে, ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি সাহিত্যকে মনে-প্রাণে একমাত্র অবলম্বন করা শুরু করে, তখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দৈন্যতা লক্ষ্যায়িত হয়। কৈশোর ও যৌবনে বাংলাকে তীব্র ঘৃণা ও নিচুশ্রেণীর ভাষা মনে করা মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরেই একটা সময় বাংলা কাব্য বা কবিতা নতুন ধারা পেতে শুরু করে ও আধুনিকতার পথ দেখে। শুধু কাব্যের বিকাশ-ই নয়,বাংলা নাটকের সূচনাও হয় তার হাত ধরে। বাংলা উপন্যাস তথা বাংলা কথাসাহিত্যের বিকাশ ঘটান বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যদিও এটাকে বিকাশ বলা চলে না।সূচনা-ই বলা চলে।কবিতা আর নাটকে মধুসূদন এবং কথাসাহিত্যে বঙ্কিম, তারা দু'জন বাংলা সাহিত্যে যে ছোট বিপ্লবটি ঘটান, এর হাত ধরেই পরবর্তী সাহিত্যিকদের দ্বারা বাংলা সাহিত্যে শুরু হয় এক নতুন দিগন্ত,এক নতুন অধ্যায়। একদিকে মধুসূদন বাংলায় প্রথম সনেট,প্রথম মহাকাব্য, প্রথম নাটক রচনা করেন, অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজি উপন্যাস পড়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে বাংলায় উপন্যাস রচনার উদ্যোগ নেন এবং যথাযথভাবে সফল হন। এরা দু'জনকেই বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রবর্তক বলা চলে। এই দুইজনের পরেই তাদের উত্তরীয় যুগের যার নামটি আসে তিনি হলেন মীর মশাররফ হোসেন। তিনি একই সাথে নাটক এবং কথাসাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই সফল হন এবং বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রবর্তক হিসেবে মধুসূদন ও বঙ্কিমের পরেই তার অবস্থান।

এরপর আসে একটা সময়,যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। আগমন ঘটে বাংলা সাহিত্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, এরপর আসেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যাদের সাহিত্যচিন্তা বিচরিত হয় বিশ্বময়। তাদের সময়ে বাংলা সাহিত্য পরিচিত হয় বিশ্ব দরবারে। মাইকেলের যুগ থেকে রবীন্দ্র-নজরুলের যুগের মধ্যে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, সত্যেন্দনাথ দত্ত, কায়কোবাদসহ আরো অনেকে বাংলা গীতিকবিতায় অবদান রেখেছেন। বাংলা আধুনিক গীতিকবিতার জনক বিহারীলাল চক্রবর্তী হলেও এর প্রকৃত ও বিশ্বময় বিকাশ সাধিত হয় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মাধ্যমেই। কথাসাহিত্যে আগমন ঘটে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। মূলত মাইকেল মধুসূদন ও বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে যে আধুনিকতার চর্চা শুরু হয়েছিল, সেটাকে আরো উচ্চ পর্যায়ে তুলে আনেন তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকেরা। এদের মধ্যে একদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,কাজী নজরুল ইসলাম,জীবনানন্দ দাশরা যেমন বাংলা কবিতাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছেন(যদিও রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের সকল শাখাতেই দারুণ সফলতার দাবিদার ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন), তেমনি অন্যদিকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়রা বাংলা কথাসাহিত্যকে উন্নত করেছেন।

এরপর বাংলা সাহিত্যে বহু নক্ষত্র এসেছেন, গিয়েছেন, যাদের পদচারণায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডার এবং বিশ্বময় হয়ে ওঠে আমাদের এই বাংলা সাহিত্য।

“হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন” 

মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন কবিতার লাইনটি লিখেছিলেন, তখন বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারে বিবধ রতন না থাকলেও তার লেখা এই লাইনটির তাৎপর্য তার পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকেরা আসলেই সার্থক করে তোলে।

বুড়িগঙ্গা

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬


বাঙ্গালা সাহিত্যের আধুনিকতার ইতিকথা

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬

featured Image




একটি ভাষার রুপ ও পরিচয়ের প্রধান দর্পন হচ্ছে সেই ভাষায় রচিত সাহিত্য। সাহিত্য শুধুমাত্র ভাষারই দর্পন নয়, সেই ভাষাভাষী সকল মানুষ তথা সমগ্র জাতির দর্পনস্বরুপ।আমরা বাঙালী জাতি। আমাদের ভাষা বাংলা।এই বাংলা ভাষারও রয়েছে এক রত্নখচিত দর্পন,যা আমাদের বাংলা সাহিত্য। এর শুরুটা কিন্তু নতুন নয়। এর ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। 

প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে অন্ধকার যুগ,মধ্যযুগ পেরিয়ে এসেও এর ধারা প্রবাহমান চলছে। চর্যাপদের মাধ্যমেই এর সূচনা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কারণ চর্যাপদের আগের কোনো নিদর্শন বাংলা সাহিত্যে পাওয়া যায়নি। এর রচনাকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও মধ্যযুগের বহু আগেই বৌদ্ধ ভিক্ষু কবিদের দ্বারা যে চর্যাপদ রচিত হয়েছিল তাতে কোনো দ্বিমত নেই। হারানো এই নিদর্শন ১৯০৭ সালে উদ্ধার করা হয়েছে, তা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য এক পরম পাওয়া।যা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছে।চর্যাপদ যদি উদ্ধার না হতো তাহলে বাংলা সাহিত্যের যে হাজার বছরের পুরাতন ইতিহাস রয়েছে তা অজানা-ই থেকে যেত। চর্যার যুগের পরের সময়কে (১২০০-১৩৫০ সাল পর্যন্ত) বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলা হয় কারণ, সেসময়ের রচিত বাংলা সাহিত্যের কোনো উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায়নি। এরপর মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যায়। শাহ মুহম্মদ সগীর,সৈয়দ আলাওল, দৌলত কাজী,আব্দুল হাকীম প্রমুখ কবিরা এবং শ্রীচৈতন্যযুগের সাহিত্যিকদের দ্বারা  অসংখ্য সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছিল যা এখনো সংরক্ষিত আছে। এছাড়া মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গলের মতো বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যগুলোও মধযুগীয় বাংলা সাহিত্যের নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম। 



বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার বহু প্রাচীন ইতিহাস ও নিদর্শন থাকলেও তার বিকাশ ও পূর্ণতা লাভ করতে বহু সময় লাগে। প্রাচীন যুগের চর্যাপদ কিংবা অন্ধকারোত্তর যুগ তথা মধ্যযুগে সাহিত্য রচনা হলেও তাতে তেমন আধুনিকত্ব ছিল না বললেই চলে। বর্তমানে আধুনিক যুগে এই প্রজন্মের কেউ সাহিত্য বললেই তার চোখে ভেসে ওঠে কবিতা,গল্প,উপন্যাস,নাটক ইত্যাদি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের আগে কবিতা বাদ দিলে বাকি সাহিত্যগুলো ছিল তো দূরের কথা, ছিল না তেমন কোনো উন্নতমানের কাব্য। বাংলা ভাষায় প্রথম মহাকাব্যটিই রচিত হয় বাংলা কাব্যে আধুনিকতার প্রবর্তক, বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের রুপকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের মাধ্যমে। বর্তমানে কাব্যগ্রন্থ বলতে যে কবিতার বই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, বাংলা সাহিত্যে সেই প্রথম আধুনা কাব্যগ্রন্থটিই হচ্ছে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'পদ্মিনী উপাখ্যান’ যা প্রকাশ হয় ১৮৫৮ সালে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যসমূহের মধ্যে অধিকাংশই ধর্মকেন্দ্রিক, কাহিনীকাব্য,রোমান্টিক উপাখ্যানকাব্য ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মঙ্গলকাব্যগুলো বিভিন্ন হিন্দু দেব-দেবীদের কাহিনী নিয়ে লেখা হতো,মৈমনসিংহ-গীতিকায় উল্লেখিত কাহিনীকাব্যগুলো যেমন - মহুয়ার পালা,দিওয়ানে মদিনা ইত্যাদি কিংবা শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘'ইউসূফ-জোলেখা’’ ইত্যাদি ছিল বিভিন্ন প্রেমকাহিনী নিয়ে রচিত। মূলত বাংলা সাহিত্য বিকাশ ও পূর্ণতা লাভের সূচনা শুরু হয় আধুনিক যুগে তথা উনিশ শতকের মাঝামাঝি ও তার পর থেকে।



ব্রিটিশ শাসন স্থায়ী হওয়ার পর যখন বাংলার নব্য বাবুসমাজ ও শিক্ষিত যুবসমাজ ব্যস্ত হয়ে পড়ে অন্ধ ইংরেজ অনুকরণে, ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি সাহিত্যকে মনে-প্রাণে একমাত্র অবলম্বন করা শুরু করে, তখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দৈন্যতা লক্ষ্যায়িত হয়। কৈশোর ও যৌবনে বাংলাকে তীব্র ঘৃণা ও নিচুশ্রেণীর ভাষা মনে করা মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরেই একটা সময় বাংলা কাব্য বা কবিতা নতুন ধারা পেতে শুরু করে ও আধুনিকতার পথ দেখে। শুধু কাব্যের বিকাশ-ই নয়,বাংলা নাটকের সূচনাও হয় তার হাত ধরে। বাংলা উপন্যাস তথা বাংলা কথাসাহিত্যের বিকাশ ঘটান বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যদিও এটাকে বিকাশ বলা চলে না।সূচনা-ই বলা চলে।কবিতা আর নাটকে মধুসূদন এবং কথাসাহিত্যে বঙ্কিম, তারা দু'জন বাংলা সাহিত্যে যে ছোট বিপ্লবটি ঘটান, এর হাত ধরেই পরবর্তী সাহিত্যিকদের দ্বারা বাংলা সাহিত্যে শুরু হয় এক নতুন দিগন্ত,এক নতুন অধ্যায়। একদিকে মধুসূদন বাংলায় প্রথম সনেট,প্রথম মহাকাব্য, প্রথম নাটক রচনা করেন, অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজি উপন্যাস পড়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে বাংলায় উপন্যাস রচনার উদ্যোগ নেন এবং যথাযথভাবে সফল হন। এরা দু'জনকেই বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রবর্তক বলা চলে। এই দুইজনের পরেই তাদের উত্তরীয় যুগের যার নামটি আসে তিনি হলেন মীর মশাররফ হোসেন। তিনি একই সাথে নাটক এবং কথাসাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই সফল হন এবং বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রবর্তক হিসেবে মধুসূদন ও বঙ্কিমের পরেই তার অবস্থান।



এরপর আসে একটা সময়,যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। আগমন ঘটে বাংলা সাহিত্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, এরপর আসেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যাদের সাহিত্যচিন্তা বিচরিত হয় বিশ্বময়। তাদের সময়ে বাংলা সাহিত্য পরিচিত হয় বিশ্ব দরবারে। মাইকেলের যুগ থেকে রবীন্দ্র-নজরুলের যুগের মধ্যে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, সত্যেন্দনাথ দত্ত, কায়কোবাদসহ আরো অনেকে বাংলা গীতিকবিতায় অবদান রেখেছেন। বাংলা আধুনিক গীতিকবিতার জনক বিহারীলাল চক্রবর্তী হলেও এর প্রকৃত ও বিশ্বময় বিকাশ সাধিত হয় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মাধ্যমেই। কথাসাহিত্যে আগমন ঘটে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। মূলত মাইকেল মধুসূদন ও বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে যে আধুনিকতার চর্চা শুরু হয়েছিল, সেটাকে আরো উচ্চ পর্যায়ে তুলে আনেন তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকেরা। এদের মধ্যে একদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,কাজী নজরুল ইসলাম,জীবনানন্দ দাশরা যেমন বাংলা কবিতাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছেন(যদিও রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের সকল শাখাতেই দারুণ সফলতার দাবিদার ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন), তেমনি অন্যদিকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়রা বাংলা কথাসাহিত্যকে উন্নত করেছেন।

এরপর বাংলা সাহিত্যে বহু নক্ষত্র এসেছেন, গিয়েছেন, যাদের পদচারণায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডার এবং বিশ্বময় হয়ে ওঠে আমাদের এই বাংলা সাহিত্য।


“হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন” 

মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন কবিতার লাইনটি লিখেছিলেন, তখন বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারে বিবধ রতন না থাকলেও তার লেখা এই লাইনটির তাৎপর্য তার পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকেরা আসলেই সার্থক করে তোলে।


বুড়িগঙ্গা

Buriganga Television is committed to delivering research-based, 
fact-driven, and impartial journalism on the geopolitical economy of the 
Indo-Pacific and the future of humanity to audiences worldwide.

Whatsapp: +8801321780900
Email: burigongatv@gmail.com
Newsroom: newsroom@burigongatv.com

স্বত্ব © বুড়িগঙ্গা মিডিয়া সেন্টার
বাঙ্গালা সাহিত্যের আধুনিকতার ইতিকথা
0:00 0:00
1.0x