প্রায় ২ কোটি টাকার ব্যাংক দায় ইউছুপের ঘাড়ে, এনসিপি নেতা হাবিব উল্লাহ ফরহাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
বিশেষ প্রতিনিধি কামরুল ইসলাম, টেকনাফ, কক্সবাজার
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পালনখালী এলাকার আল-আরাফা এজেন্ট ব্যাংককে ঘিরে প্রায় ২ কোটি টাকার গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ, মাদক মামলায় জড়ানো, ১১ লাখ টাকা নেওয়া এবং ঢাকায় অপহরণ করে জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তুলেছেন ব্যাংকটির সাবেক কর্মচারী মো. ইউছুপের বাবা মহিউদ্দিন।
মহিউদ্দিনের অভিযোগ, ব্যাংকের গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের দায় তাঁর ছেলে ইউছুপের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাঁকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। এমনকি মাদক মামলায় জড়ানো এবং পরবর্তীতে ঢাকায় একটি দল তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকার দায় স্বীকার করানোর জন্য স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মো. ইউছুপ (২৮), পিতা-মহিউদ্দিন ও মাতা-ছেনুয়ারা বেগম। তাঁর বাড়ি টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাঞ্জরপাড়া এলাকায়।
মহিউদ্দিন জানান, তাঁর ছেলে পালনখালী আল-আরাফা এজেন্ট ব্যাংকে প্রায় পাঁচ বছর অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নিজেও একই প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন বছর চাকরি করেছেন বলে জানান।
পরিবারের দাবি, ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে ইউছুপ কোনো গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করেননি। পরবর্তীতে ব্যাংকের ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ওঠার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলেও দাবি করেন মহিউদ্দিন।
মহিউদ্দিনের ভাষ্য, গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় তাঁর ছেলে ইউছুপকে ৫ নম্বর আসামি করা হয়। তবে তাঁর দাবি, ইউছুপ হিসাব-নিকাশের দায়িত্বে থাকলেও গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
মাদক মামলায় জড়ানোর অভিযোগ
মহিউদ্দিন অভিযোগ করেন, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দায় এড়াতে হাবিব উল্লাহ ফরহাদ বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁর ছেলে ইউছুপ ও তাঁর স্ত্রীকে মাদক মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করেন।
পরিবারের দাবি, পরবর্তীতে টেকনাফ মডেল থানায় দায়ের করা একটি মাদক মামলায় ইউছুপ ও তাঁর স্ত্রীকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। এরপর তাঁরা দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন এবং কক্সবাজারের খুরুশকুল এলাকায় অবস্থান করেন বলে জানান মহিউদ্দিন।
১১ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
মহিউদ্দিনের আরও অভিযোগ, হাবিব উল্লাহ ফরহাদ তাঁর রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে ইউছুপকে মাদক মামলার চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ আশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁর কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মহিউদ্দিন বলেন, ছেলেকে মামলা থেকে রক্ষা করার আশায় পরিবারের ঘরবাড়ি ও ইউছুপের স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করে ওই টাকা সংগ্রহ করা হয়। পরে টাকা ফরহাদের হাতে তুলে দেওয়া হলেও বিভিন্ন অজুহাতে বিষয়টি কালক্ষেপণ করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
প্রায় ২ কোটি টাকার দায় ইউছুপের ওপর চাপানোর অভিযোগ
মহিউদ্দিনের দাবি, পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকের গ্রাহকদের প্রায় ২ কোটি টাকার দায় তাঁর ছেলে ইউছুপের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
তিনি অভিযোগ করেন, ইউছুপের কাছ থেকে এমন একটি লিখিত দলিলে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে ব্যাংকের গ্রাহকদের বিপুল অর্থের দায় তাঁর ছেলের ওপর চাপানোর কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
ঢাকায় অপহরণ ও ১ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ
মহিউদ্দিনের ভাষ্য, ঢাকায় ইউছুপের সঙ্গে হাবিব উল্লাহ ফরহাদের সাক্ষাৎ হওয়ার পর প্রায় ২০ জনের একটি দল তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইউছুপকে একটি স্থানে আটকে রেখে চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং ব্যাংকের প্রায় ২ কোটি টাকার দায় স্বীকার করানোর জন্য স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
মহিউদ্দিন আরও দাবি করেন, অপহরণের পর ইউছুপের মোবাইল ফোন থেকে পরিবারের কাছে ফোন করে ১ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ইউছুপকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরে বিষয়টি ঢাকায় থাকা আত্মীয়-স্বজনদের জানানো হলে তাঁরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরিবারের দাবি, পুলিশের সহযোগিতায় মোবাইল ফোনের লোকেশন শনাক্ত করে ইউছুপকে উদ্ধার করা হয়।
তবে উদ্ধার হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা চলমান থাকায় তাঁকে কক্সবাজার কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান মহিউদ্দিন।
৩০ মে ২০২৫ টেকনাফ মডেল থানায় মামলা
মহিউদ্দিন জানান, এসব ঘটনায় ২০২৫ সালের ৩০ মে টেকনাফ মডেল থানায় দুইজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, ওই মামলাসহ সংশ্লিষ্ট সব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, ইউছুপকে মামলায় জড়ানোর অভিযোগ, ১১ লাখ টাকা নেওয়া, অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি এবং জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টার প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
বাবার আকুতি—অপরাধ করলে বিচার হোক, নিরপরাধ হলে ফাঁসানো বন্ধ হোক
মহিউদ্দিন বলেন, “আমার ছেলে প্রায় পাঁচ বছর ব্যাংকে চাকরি করেছে। সে যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে সুষ্ঠু তদন্ত করে আইন অনুযায়ী তার বিচার হোক। কিন্তু ব্যাংকের প্রায় ২ কোটি টাকার দায় আমার ছেলের ঘাড়ে চাপানোর জন্য তাকে অপহরণ করে জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকলে সেটিও তদন্ত করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে ১১ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে আমরা অভিযোগ করছি। এরপর আবার ঢাকায় তাকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি এবং স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা কোনো প্রতিশোধ চাই না। আমরা চাই প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক।”
মহিউদ্দিনের দাবি, তাঁর ছেলে ও পরিবারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনগত প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে ব্যাংকের গ্রাহকদের টাকা কোথায় গেছে, কারা ওই অর্থের সঙ্গে জড়িত, কেন ইউছুপকে আসামি করা হয়েছে এবং ঢাকায় তাঁকে অপহরণ করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
পরিবারের ছয় দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ছয় দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো—
১. পালনখালী আল-আরাফা এজেন্ট ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন।
২. ব্যাংকের প্রায় ২ কোটি টাকার দায় প্রকৃতপক্ষে কার ওপর বর্তায়, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ।
৩. মো. ইউছুপ ও তাঁর স্ত্রীকে মাদক মামলায় জড়ানোর অভিযোগ তদন্ত।
৪. মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে ১১ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
৫. ঢাকায় ইউছুপকে অপহরণ, ১ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি এবং জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
৬. মো. ইউছুপ ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ৩০ মে ২০২৫ তারিখে টেকনাফ মডেল থানায় দায়ের করা মামলাসহ সংশ্লিষ্ট সব মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত করা।
এ বিষয়ে হাবিব উল্লাহ ফরহাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছে ইউছুপের পরিবার।