ঢাকা    সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুড়িগঙ্গা

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?



টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা যে কাজটি করি, তার অন্যতম হলো দাঁত ব্রাশ করা। সুস্থ দাঁত ও মুখের যত্নে টুথপেস্ট ব্যবহার যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সেই টুথপেস্টেই যদি থাকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এটি কি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ?

সম্প্রতি পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও) দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে। তাদের গবেষণায় ২৬টি নমুনায়, অর্থাৎ প্রায় ৭৬.৫ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শিশুদের জন্য বাজারজাত কয়েকটি টুথপেস্টেও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা। এতটাই ক্ষুদ্র যে সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না। বড় প্লাস্টিক ভেঙে যেমন এসব কণা তৈরি হয়, তেমনি শিল্পকারখানায় ইচ্ছাকৃতভাবেও বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহারের জন্য ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা তৈরি করা হয়।

টুথপেস্টে কেন থাকতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু টুথপেস্টে বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক পলিমার ব্যবহার করা হয়। অতীতে দাঁত পরিষ্কার বা পালিশের অনুভূতি দিতে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাও ব্যবহৃত হতো। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে কম খরচে পণ্যের ওজন বা ঘনত্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্যেও এ ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কোন ব্র্যান্ডে কী কারণে এসব উপাদান ব্যবহার হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।

শরীরে কীভাবে প্রবেশ করে?

দাঁত ব্রাশ করার সময় বেশির ভাগ টুথপেস্ট আমরা থুতুর সঙ্গে ফেলে দিই। তবে অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা অস্বাভাবিক নয়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। সেই সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যদিও সুস্থ মাড়ি দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এটি শোষিত হওয়ার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি উদ্বেগের হলেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো নয়। মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এর সঙ্গে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন, হৃদ্‌রোগ, স্নায়ুতন্ত্র ও প্রজননস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এসব সম্পর্ক এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

টুথপেস্ট কেনার সময় কী খেয়াল রাখবেন?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, টুথপেস্ট কেনার আগে উপাদানের তালিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত ১,০০০ থেকে ১,৫০০ পিপিএম ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট উপযোগী। পাশাপাশি পলিইথিলিন (PE), পলিপ্রোপাইলিন (PP) বা অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক পলিমার রয়েছে কি না, তা খেয়াল করা উচিত। নিরাপদ অ্যাব্রেসিভ হিসেবে হাইড্রেটেড সিলিকা বা ক্যালসিয়াম কার্বোনেট থাকলে ভালো। যাদের মুখে ঘা হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তারা চাইলে SLS-মুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করতে পারেন।

এ ছাড়া ছোট শিশুদের টুথপেস্ট গিলে ফেলা থেকে বিরত রাখতে হবে এবং প্রয়োজনের বেশি টুথপেস্ট ব্যবহার না করাই ভালো। শুধু ‘ন্যাচারাল’ বা ‘হারবাল’ লেখা দেখে কোনো পণ্যকে নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়; উপাদানের তালিকা এবং বিএসটিআইয়ের অনুমোদনও দেখে নেওয়া উচিত।

এখন কী করা প্রয়োজন?

ইএসডিওর দাবি, দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে এখনো কোনো জাতীয় মানদণ্ড, বাধ্যতামূলক পরীক্ষাপদ্ধতি বা লেবেলিং নীতি নেই। তাই পণ্যের উপাদান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা, নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং জাতীয় মানদণ্ড হালনাগাদ করা জরুরি। এদিকে বিএসটিআই জানিয়েছে, টুথপেস্টের জাতীয় মানে মাইক্রোপ্লাস্টিক-সংক্রান্ত বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগ বিবেচনা করা হচ্ছে।

শেষ কথা

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তবে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য দেখে আতঙ্কিত না হয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সচেতন ভোক্তা হিসেবে টুথপেস্টের উপাদান সম্পর্কে জানুন, শিশুদের ব্যবহারে সতর্ক থাকুন এবং সম্ভব হলে মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত পণ্য বেছে নিন।

বিষয় : মাইক্রোপ্লাস্টিক টুথপেস্ট

বুড়িগঙ্গা

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬


টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬

featured Image

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা যে কাজটি করি, তার অন্যতম হলো দাঁত ব্রাশ করা। সুস্থ দাঁত ও মুখের যত্নে টুথপেস্ট ব্যবহার যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সেই টুথপেস্টেই যদি থাকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এটি কি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ?

সম্প্রতি পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও) দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে। তাদের গবেষণায় ২৬টি নমুনায়, অর্থাৎ প্রায় ৭৬.৫ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শিশুদের জন্য বাজারজাত কয়েকটি টুথপেস্টেও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা। এতটাই ক্ষুদ্র যে সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না। বড় প্লাস্টিক ভেঙে যেমন এসব কণা তৈরি হয়, তেমনি শিল্পকারখানায় ইচ্ছাকৃতভাবেও বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহারের জন্য ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা তৈরি করা হয়।

টুথপেস্টে কেন থাকতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু টুথপেস্টে বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক পলিমার ব্যবহার করা হয়। অতীতে দাঁত পরিষ্কার বা পালিশের অনুভূতি দিতে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাও ব্যবহৃত হতো। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে কম খরচে পণ্যের ওজন বা ঘনত্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্যেও এ ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কোন ব্র্যান্ডে কী কারণে এসব উপাদান ব্যবহার হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।

শরীরে কীভাবে প্রবেশ করে?

দাঁত ব্রাশ করার সময় বেশির ভাগ টুথপেস্ট আমরা থুতুর সঙ্গে ফেলে দিই। তবে অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা অস্বাভাবিক নয়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। সেই সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যদিও সুস্থ মাড়ি দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এটি শোষিত হওয়ার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি উদ্বেগের হলেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো নয়। মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এর সঙ্গে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন, হৃদ্‌রোগ, স্নায়ুতন্ত্র ও প্রজননস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এসব সম্পর্ক এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

টুথপেস্ট কেনার সময় কী খেয়াল রাখবেন?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, টুথপেস্ট কেনার আগে উপাদানের তালিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত ১,০০০ থেকে ১,৫০০ পিপিএম ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট উপযোগী। পাশাপাশি পলিইথিলিন (PE), পলিপ্রোপাইলিন (PP) বা অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক পলিমার রয়েছে কি না, তা খেয়াল করা উচিত। নিরাপদ অ্যাব্রেসিভ হিসেবে হাইড্রেটেড সিলিকা বা ক্যালসিয়াম কার্বোনেট থাকলে ভালো। যাদের মুখে ঘা হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তারা চাইলে SLS-মুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করতে পারেন।

এ ছাড়া ছোট শিশুদের টুথপেস্ট গিলে ফেলা থেকে বিরত রাখতে হবে এবং প্রয়োজনের বেশি টুথপেস্ট ব্যবহার না করাই ভালো। শুধু ‘ন্যাচারাল’ বা ‘হারবাল’ লেখা দেখে কোনো পণ্যকে নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়; উপাদানের তালিকা এবং বিএসটিআইয়ের অনুমোদনও দেখে নেওয়া উচিত।

এখন কী করা প্রয়োজন?

ইএসডিওর দাবি, দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে এখনো কোনো জাতীয় মানদণ্ড, বাধ্যতামূলক পরীক্ষাপদ্ধতি বা লেবেলিং নীতি নেই। তাই পণ্যের উপাদান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা, নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং জাতীয় মানদণ্ড হালনাগাদ করা জরুরি। এদিকে বিএসটিআই জানিয়েছে, টুথপেস্টের জাতীয় মানে মাইক্রোপ্লাস্টিক-সংক্রান্ত বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগ বিবেচনা করা হচ্ছে।

শেষ কথা

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তবে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য দেখে আতঙ্কিত না হয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সচেতন ভোক্তা হিসেবে টুথপেস্টের উপাদান সম্পর্কে জানুন, শিশুদের ব্যবহারে সতর্ক থাকুন এবং সম্ভব হলে মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত পণ্য বেছে নিন।


বুড়িগঙ্গা

Buriganga Television is committed to delivering research-based, 
fact-driven, and impartial journalism on the geopolitical economy of the 
Indo-Pacific and the future of humanity to audiences worldwide.

Whatsapp: +8801321780900
Email: burigongatv@gmail.com
Newsroom: newsroom@burigongatv.com

স্বত্ব © বুড়িগঙ্গা মিডিয়া সেন্টার
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?
0:00 0:00
1.0x