ওয়েবসাইটে ভুয়া নম্বর, টেবিলে টেবিলে ঘুষ: বান্দরবান পাসপোর্ট অফিসের ‘তিন মূর্তির’ কাণ্ডকীতি প্রকাশ।
টাকা দিলে মেলে পাসপোর্ট, না দিলে পদে পদে হয়রানি। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে বহিরাগতদের পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ। এমনকি কর্মচারীর নিজের মোটরসাইকেলে ঝুলছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভুয়া স্টিকার! পার্বত্য জেলা বান্দরবান আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস যেন পরিণত হয়েছে একশ্রেণির কর্মচারীর খাসতালুকে।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বান্দরবান পাসপোর্ট অফিসের যাবতীয় অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এই ‘তিনজনের সিন্ডিকেট’-এর মূলে রয়েছেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সাজু বড়ুয়া, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. মোস্তফা কামাল খান এবং রেকর্ড কিপার নিউটন বড়ুয়া। তাঁদের ঘিরে তৈরি হওয়া শক্ত বলয়ের কারণে তছনছ হয়ে পড়েছে সরকারি সেবার ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।ভুক্তভোগীদের সরাসরি অভিযোগ, বান্দরবানের স্থায়ী বাসিন্দা না হওয়া সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বহিরাগতদের পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে এই চক্র। অথচ নিয়ম মেনে সাধারণ নাগরিকরা সরাসরি সেবা নিতে গেলে নথিপত্র ঠিক থাকার পরও দেওয়া হয় নানা অজুহাত। বাধ্য করা হয় দালালের শরণাপন্ন হতে বা ঘুষ দিতে।সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সাজু বড়ুয়ার বিষয়ে। তিনি নিজের ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে ঘুরছেন। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, ‘গাড়ি চুরি হওয়ার আশঙ্কায়’ তিনি মন্ত্রণালয়ের স্টিকার ব্যবহার করেন! সরকারি বিধিমালা তোয়াক্কা না করে কীভাবে তিনি ব্যক্তিগত যানবাহনে সরকারি মন্ত্রণালয়ের পরিচয় ব্যবহার করছেন, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সাজু বড়ুয়া নিজেকে ‘সাংবাদিক’ পরিচয়েও প্রভাব খাটিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যা সরকারি চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।অনিয়ম ঢাকা দিতে তথ্য গোপনেরও কৌশল নিয়েছে এই দপ্তর। সরকারি ওয়েবসাইটে বান্দরবান পাসপোর্ট অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামের পাশে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে একই ফোন নম্বর! নাগরিকরা প্রয়োজনের সময় ফোন দিলে তা কেউ ধরে না। ফলে সেবাপ্রার্থীরা চরম বিভ্রান্তি ও ভোগান্তিতে পড়ছেন।এসব আশঙ্কাজনক অনিয়মের বিষয়ে বান্দরবান আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক সচিব কুমার আইনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এক প্রকার দায়সারা বক্তব্য দেন। তিনি জানান, তাঁর অফিসের কেউ অনিয়মে জড়িত থাকলে তা যেন তাঁকে জানানো হয়। তবে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—নিজের নাকের ডগায় কর্মচারী কীভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগিয়ে দালালির রাজত্ব চালায়, তা নজরদারিতে প্রশাসনিক ব্যর্থতা কেন?নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে এই তিন কর্মচারীর অপকর্ম, বহিরাগতদের পাসপোর্ট দেওয়ার জালিয়াতি এবং যোগাযোগের ভুয়া তথ্যের বিষয়ে অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বান্দরবানবাসী।