ঢাকা    রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
বুড়িগঙ্গা

যুদ্ধের ক্ষতি, জ্বালানির ধাক্কা: দরিদ্র দেশগুলোর পাশে দাঁড়াবে কে?



যুদ্ধের ক্ষতি, জ্বালানির ধাক্কা: দরিদ্র দেশগুলোর পাশে দাঁড়াবে কে?
থাইল্যান্ডে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলন

যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও ঋণের বাড়তি বোঝায় চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংঘাতের কারণে বাণিজ্যপথে বিঘ্ন, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের ঋণের চাপ সামলাতে এসব দেশের আরও সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে নতুন অর্থায়নের পরিমাণ, ঋণ মওকুফ কিংবা যুদ্ধের ক্ষতি সামলাতে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসায় অনিশ্চয়তা কাটেনি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিনে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট, ঋণের চাপ ও উন্নয়নের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সহজ শর্তে ঋণ, ঋণ পুনর্গঠন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্য রাজস্বনীতি এবং সরকারি ব্যয়ের সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। একইসঙ্গে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ঠিক কতটা অতিরিক্ত সহায়তা পাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আশ্বাসের পাশাপাশি বাস্তবে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।

ঋণের সুদেই যাচ্ছে রাজস্বের বড় অংশ

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ পরিশোধ। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এসব দেশের রাজস্বের যে অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়, তা ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

এর অর্থ, সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করছে, তার বড় অংশই ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করার সুযোগ কমে আসছে।

জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের অনেক দেশ ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু উচ্চ সুদের কারণে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই অগ্রগতির সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।

তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর করের মতো প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম তাঁদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে।

এ পরিস্থিতিতে সব দেশকে একই ধরনের ব্যয় সংকোচনের পথে যেতে হবে— এমন ধারণার বিরোধিতা করেছেন আইএমএফের প্রধান। তাঁর বক্তব্য, প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণের ধরন ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নীতি নির্ধারণ করতে হবে।

সহজ শর্তে অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে আইএমএফের দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিলের (পিআরজিটি) আওতায় অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ তহবিল থেকে যোগ্য দেশগুলো তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ পায়।

শনিবার আইএমএফের নীতিনির্ধারণী কমিটির বৈঠকেও তহবিলটিতে সদস্যদেশগুলোর অবদান বাড়ানোর বিষয়ে সমর্থন জানানো হয়। সংঘাত, বাণিজ্যপথে বিঘ্ন এবং জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সহায়তা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আইএমএফের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সংস্কারের ফলে আগের তুলনায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে তহবিলে নতুন করে কত অর্থ যুক্ত হবে, কোন দেশ কতটা পাবে এবং কবে নাগাদ সেই অর্থ ছাড় করা হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি। ফলে সংকটে থাকা দেশগুলোর তাৎক্ষণিক অর্থের চাহিদা কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ঋণ পুনর্গঠনে দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ

ঋণের চাপ কমাতে শুধু নতুন ঋণ দেওয়া যথেষ্ট নয়। যেসব দেশের ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য দ্রুত ও কার্যকর ঋণ পুনর্গঠনও জরুরি বলে মনে করছে আইএমএফ।

জর্জিয়েভা বলেন, যেসব দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জি-২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কিছু দেশের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হলেও তাৎক্ষণিক অর্থের ঘাটতি রয়েছে। এসব দেশের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ পুনর্গঠনে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ অব্যাহত থাকে। এতে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নমূলক ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে অর্থ কমে যায়। তাই ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

নিম্ন আয়ের দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলার

ঋণের চাপের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের দেশগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা বেসরকারি বিনিয়োগের ঘাটতি। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাংগার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের উদ্যোগে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রেকর্ড ১১২ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি মূলধন সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ ধরনের বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলার।

এ চিত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগের অসম বণ্টন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামগ্রিকভাবে বেসরকারি মূলধন বাড়লেও সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলো এর সুবিধা তুলনামূলক কম পাচ্ছে।

দুর্বল অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পরিবহন সংকট, ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এসব দেশে মূলধন আকর্ষণের পথে বাধা তৈরি করছে। অথচ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা শুধু ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের পরিবেশ তৈরিতেও সহায়তা প্রয়োজন।

ব্যয় সংকোচনে বাড়ছে সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ

ঋণের বোঝা ও জ্বালানি-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে কঠিন নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণ পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি—দুই পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে সরকারগুলোকে।

আইএমএফ সরকারি আর্থিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ব্যয় কমানো বা রাজস্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানি ও খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সবার জন্য সমান ভর্তুকির পরিবর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার কথাও বলছে সংস্থাটি।

তবে উন্নয়নকর্মীদের আশঙ্কা, যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া ভর্তুকি কমানো বা সরকারি ব্যয়ে কাটছাঁট করলে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন ঘিরে বিক্ষোভকারীরাও সামাজিক ব্যয় কমানোর পরিবর্তে জলবায়ু অর্থায়ন, কর সংস্কার এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান।

বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও এ পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ সামলাতে হচ্ছে সরকারকে।

রাজস্বের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আবার জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ে।

এ পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি সেই অর্থ কীভাবে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়াবে, তা বিবেচনায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, কার্যকর ঋণ পুনর্গঠন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

ব্যাংককের সম্মেলনে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সংকট স্বীকৃতি পেলেও যুদ্ধ ও জ্বালানির ধাক্কা সামলাতে নতুন অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বা বিশেষ সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা আসেনি। ফলে এসব দেশের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সহায়তায় রূপ দেওয়া এবং ঋণের চাপ সামলেও উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা ধরে রাখা।

বিষয় : বিশ্ব অর্থনীতি আইএমএফ

বুড়িগঙ্গা

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


যুদ্ধের ক্ষতি, জ্বালানির ধাক্কা: দরিদ্র দেশগুলোর পাশে দাঁড়াবে কে?

প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও ঋণের বাড়তি বোঝায় চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংঘাতের কারণে বাণিজ্যপথে বিঘ্ন, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের ঋণের চাপ সামলাতে এসব দেশের আরও সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে নতুন অর্থায়নের পরিমাণ, ঋণ মওকুফ কিংবা যুদ্ধের ক্ষতি সামলাতে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসায় অনিশ্চয়তা কাটেনি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিনে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট, ঋণের চাপ ও উন্নয়নের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সহজ শর্তে ঋণ, ঋণ পুনর্গঠন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্য রাজস্বনীতি এবং সরকারি ব্যয়ের সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। একইসঙ্গে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ঠিক কতটা অতিরিক্ত সহায়তা পাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আশ্বাসের পাশাপাশি বাস্তবে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।

ঋণের সুদেই যাচ্ছে রাজস্বের বড় অংশ

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ পরিশোধ। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এসব দেশের রাজস্বের যে অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়, তা ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

এর অর্থ, সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করছে, তার বড় অংশই ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করার সুযোগ কমে আসছে।

জর্জিয়েভা বলেন, নিম্ন আয়ের অনেক দেশ ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু উচ্চ সুদের কারণে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই অগ্রগতির সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।

তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর করের মতো প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম তাঁদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে।

এ পরিস্থিতিতে সব দেশকে একই ধরনের ব্যয় সংকোচনের পথে যেতে হবে— এমন ধারণার বিরোধিতা করেছেন আইএমএফের প্রধান। তাঁর বক্তব্য, প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণের ধরন ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নীতি নির্ধারণ করতে হবে।

সহজ শর্তে অর্থায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে আইএমএফের দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিলের (পিআরজিটি) আওতায় অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ তহবিল থেকে যোগ্য দেশগুলো তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ পায়।

শনিবার আইএমএফের নীতিনির্ধারণী কমিটির বৈঠকেও তহবিলটিতে সদস্যদেশগুলোর অবদান বাড়ানোর বিষয়ে সমর্থন জানানো হয়। সংঘাত, বাণিজ্যপথে বিঘ্ন এবং জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সহায়তা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আইএমএফের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সংস্কারের ফলে আগের তুলনায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে তহবিলে নতুন করে কত অর্থ যুক্ত হবে, কোন দেশ কতটা পাবে এবং কবে নাগাদ সেই অর্থ ছাড় করা হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি। ফলে সংকটে থাকা দেশগুলোর তাৎক্ষণিক অর্থের চাহিদা কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

ঋণ পুনর্গঠনে দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ

ঋণের চাপ কমাতে শুধু নতুন ঋণ দেওয়া যথেষ্ট নয়। যেসব দেশের ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য দ্রুত ও কার্যকর ঋণ পুনর্গঠনও জরুরি বলে মনে করছে আইএমএফ।

জর্জিয়েভা বলেন, যেসব দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জি-২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কিছু দেশের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হলেও তাৎক্ষণিক অর্থের ঘাটতি রয়েছে। এসব দেশের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ পুনর্গঠনে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ অব্যাহত থাকে। এতে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নমূলক ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে অর্থ কমে যায়। তাই ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

নিম্ন আয়ের দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলার

ঋণের চাপের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের দেশগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা বেসরকারি বিনিয়োগের ঘাটতি। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাংগার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের উদ্যোগে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রেকর্ড ১১২ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি মূলধন সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ ধরনের বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলার।

এ চিত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগের অসম বণ্টন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামগ্রিকভাবে বেসরকারি মূলধন বাড়লেও সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলো এর সুবিধা তুলনামূলক কম পাচ্ছে।

দুর্বল অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পরিবহন সংকট, ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এসব দেশে মূলধন আকর্ষণের পথে বাধা তৈরি করছে। অথচ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা শুধু ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের পরিবেশ তৈরিতেও সহায়তা প্রয়োজন।

ব্যয় সংকোচনে বাড়ছে সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ

ঋণের বোঝা ও জ্বালানি-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে কঠিন নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণ পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি—দুই পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে সরকারগুলোকে।

আইএমএফ সরকারি আর্থিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ব্যয় কমানো বা রাজস্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানি ও খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সবার জন্য সমান ভর্তুকির পরিবর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার কথাও বলছে সংস্থাটি।

তবে উন্নয়নকর্মীদের আশঙ্কা, যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া ভর্তুকি কমানো বা সরকারি ব্যয়ে কাটছাঁট করলে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন ঘিরে বিক্ষোভকারীরাও সামাজিক ব্যয় কমানোর পরিবর্তে জলবায়ু অর্থায়ন, কর সংস্কার এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান।

বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও এ পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ সামলাতে হচ্ছে সরকারকে।

রাজস্বের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আবার জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ে।

এ পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি সেই অর্থ কীভাবে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়াবে, তা বিবেচনায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, কার্যকর ঋণ পুনর্গঠন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

ব্যাংককের সম্মেলনে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সংকট স্বীকৃতি পেলেও যুদ্ধ ও জ্বালানির ধাক্কা সামলাতে নতুন অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বা বিশেষ সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা আসেনি। ফলে এসব দেশের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সহায়তায় রূপ দেওয়া এবং ঋণের চাপ সামলেও উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা ধরে রাখা।


বুড়িগঙ্গা

Buriganga Television is committed to delivering research-based, 
fact-driven, and impartial journalism on the geopolitical economy of the 
Indo-Pacific and the future of humanity to audiences worldwide.

Whatsapp: +8801321780900
Email: burigongatv@gmail.com
Newsroom: newsroom@burigongatv.com

স্বত্ব © বুড়িগঙ্গা মিডিয়া সেন্টার
যুদ্ধের ক্ষতি, জ্বালানির ধাক্কা: দরিদ্র দেশগুলোর পাশে দাঁড়াবে কে?
0:00 0:00
1.0x