রাস্তার ধুলোবালি, চেহারায় জমে থাকা ময়লা, এলোমেলো চুল—এসব চিত্র মানসিক ভারসাম্যহীন অসহায় মানুষদের জন্য যেন এক অদৃশ্য শিকল। সমাজের চোখে তারা অবহেলিত, নিজেদের দেখভালেরও কোনো উপায় নেই। খাবার খাওয়ারও নিশ্চয়তা নেই, পরিচ্ছন্নতা তো দূরের কথা। রাস্তার ধুলোয় পড়ে থাকা এই মানুষগুলোকে আমরা প্রায়ই দেখি, কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবি—তারা একটু যত্ন পেলে কেমন হবে? কিন্তু একজন মানুষ আছেন, যিনি এসব অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দেই কাজ করে যাচ্ছেন। তার নাম মাহবুব।
মাহবুব একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর, তবে তার কাজ কেবল ভিডিও তৈরি করা নয়। তিনি এমন একটি কাজ করেন, যা অনেকেই দেখেও না দেখার ভান করে। রাস্তার পাশে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের চুল কেটে, গোসল করিয়ে, পরিষ্কার করে, নতুন রূপ দেন তিনি। এসব মানুষ নিজেদের যত্ন নিতে পারেন না, ধীরে ধীরে তাদের চেহারায় জমতে থাকে অপরিচ্ছন্নতা আর অবহেলার ছাপ। মাহবুব সেই ছাপ মুছে দিতে চান। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে যা পারেন, তাই নিয়েই নেমে পড়েন এই কাজ করতে। নিজের টাকায় কেনেন কাঁচি, শ্যাম্পু, সাবান, স্যানিটাইজার, নতুন জামাকাপড়। তারপর খুঁজে নেন এমন মানুষ, যাদের এই যত্ন প্রয়োজন। প্রথমে ধৈর্য ধরে তাদের বোঝান, ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করেন। তারপর শুরু হয় তার কাজ—চুল কাটা, দাড়ি কামানো, গায়ে পানি ঢেলে গোসল করানো, সাবান দিয়ে পুরো শরীরটা পরিষ্কার করা। এরপর একটা নতুন জামা গায়ে চাপিয়ে যখন আয়নায় তাক করিয়ে দেন, তখন তাদের মুখের হাসিই বলে দেয়, কতটা স্বস্তি পেয়েছেন তারা। সেই চোখেমুখে এক অদ্ভুত আনন্দের ঝলক দেখা যায়—যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন!
মাহবুব জানান, ‘আমি জানি, হয়তো আমি পুরো পৃথিবী বদলাতে পারবো না, কিন্তু যদি একজন মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারি, সেটাই আমার জন্য অনেক কিছু। অনেকেই প্রশ্ন করেন, ‘এত কষ্ট করে লাভ কী?’ আমি বলি, যখন আমি রাস্তার সেই অসহায় মানুষটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করি, নতুন জামা গায়ে দিই, তখন মনে হয়, যেন আমি নিজেকেই নতুন করে সাজাচ্ছি। এটা শুধু চুল কাটা বা গোসল করানো নয়, এটা তাদের প্রতি আমার ভালোবাসার প্রকাশ। এই কাজ করতে গিয়ে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি, অনেকে সন্দেহের চোখে দেখেছে, কটাক্ষও করেছে। কিন্তু আমি থামিনি, থামবোও না। আমি চাই, আরও অনেক মানুষ এগিয়ে আসুক, যেন এই অবহেলিত মানুষগুলোর প্রতি আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়।
ধন্যবাদ সবাইকে, যারা আমার পাশে থাকেন, অনুপ্রেরণা দেন। একদিন হয়তো আমরা সবাই মিলে এই মানুষগুলোর জন্য আরও বড় কিছু করতে পারবো।’
এভাবেই নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন মাহবুব। ধীরে ধীরে তার এই উদ্যোগ মানুষের নজরে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি তার এই কাজের ভিডিও শেয়ার করেন, যাতে আরও মানুষ অনুপ্রাণিত হয়। এরই মধ্যে মাহবুবের ফেসবুক পেইজটিতে প্রায় ৮ লক্ষাধিক মানুষ অনুসরণ করছে। অনেকেই তার এই কাজের প্রশংসা করেন, আবার কেউ কেউ অবিশ্বাস করেন। কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, “এত কষ্ট করে লাভ কী?” তার উত্তর খুব সহজ—”আমি যখন তাদের পরিস্কার করি, তখন মনে হয়, আমি নিজেকেই পরিস্কার করছি।” এই সমাজে আমরা সবাই নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। ভেবে দেখার সময় হয় না, আশপাশের অবহেলিত মানুষের কী প্রয়োজন। কিন্তু মাহবুব দেখিয়েছেন, একটু সদিচ্ছা থাকলেই পরিবর্তন আনা সম্ভব। শুধু অর্থ দিয়ে সাহায্য করা নয়, বরং ভালোবাসা দিয়েও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের পাশে দাঁড়ানো যায়।
মাহবুব চান, এই কাজ আরও বড় পরিসরে করতে। ভবিষ্যতে যদি তিনি একটি টিম গঠন করতে পারেন, তাহলে আরও অনেক মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার সুযোগ পাবে। তার স্বপ্ন, সমাজের অন্যরাও এগিয়ে আসবে, যেন এই মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা বাড়ে। যদি সঠিক সাহায্য পাওয়া যায়, তাহলে হয়তো একদিন এসব মানুষও সমাজের মূলধারায় ফিরে আসতে পারবে।
মাহবুবের মতো মানুষরা সমাজে আলো ছড়ায়। তার হাতের কাঁচির শব্দ যেন বলে, “মানবিকতা এখনো বেঁচে আছে!” এক নিঃশব্দ বিপ্লবী হয়ে তিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন, সত্যিকারের ভালোবাসা আসলে কাজের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।
এই সমাজে মাহবুবের মতো আরও মানুষ প্রয়োজন। যারা দেখিয়ে দেবেন, সাহায্য মানে শুধু দান করা নয়—বরং হাত বাড়িয়ে দেওয়া, ভালোবাসা দেওয়া। মাহবুব সেটাই করছেন, নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে। তিনি একাই বদল আনতে পারেন না, কিন্তু তার কাজ প্রমাণ করে, যদি আমরা সবাই একটু এগিয়ে আসি, তাহলে সমাজের এই অবহেলিত মানুষগুলোর জীবনেও নতুন আলো জ্বলে উঠতে পারে।

