ঢাকা    সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
বুড়িগঙ্গা

পছন্দের জিনিস না পেলেই কান্না, কথায় কথায় জেদ—কেন এমন করে শিশুরা?



পছন্দের জিনিস না পেলেই কান্না, কথায় কথায় জেদ—কেন এমন করে শিশুরা?
প্রতীকী ছবি/এআই

দোকানে পছন্দের খেলনা কিনে দেওয়া হয়নি। ব্যস, মেঝেতে শুয়ে কান্না শুরু করল শিশু। কখনও চিৎকার, কখনও হাত-পা ছোড়া। মা-বাবা বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ধমক দিচ্ছেন। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত কান্না থামাতে শিশুর আবদারও মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল, আবারও একই ঘটনা।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবকের মনে প্রশ্ন জাগে, শিশুকে কি ঠিকভাবে শাসন করা হচ্ছে না? এত বোঝানোর পরও সে নিজের রাগ সামলাতে শিখছে না কেন?

শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোটদের এমন আচরণকে শুধু জেদ বা অবাধ্যতা হিসেবে দেখলে ভুল হতে পারে। কারণ, নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা এক দিনে তৈরি হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং মা-বাবার কাছ থেকে শিখতে শিখতেই শিশু ধীরে ধীরে এই দক্ষতা অর্জন করে।

মনোবিদরা বলছেন, শিশুকে শুধু শান্ত হতে বললেই হবে না; তাকে আবেগ সামলাতেও শেখাতে হবে।

রাগ হলেই কি শিশু অবাধ্য?

কোনও কিছু না পেলে বা মনের ইচ্ছা পূরণ না হলে ছোট শিশুরা সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই হতাশা কীভাবে সামলাতে হয়, তা তারা তখনও ভালোভাবে শেখেনি।

বড়রা মন খারাপ বা রাগ হলেও অনেক সময় নিজেদের সামলে নিতে পারেন। ছোটদের ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। ফলে রাগের মুহূর্তে তারা চিৎকার করতে পারে, কাঁদতে পারে কিংবা জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলতে পারে।

এর মানে এই নয় যে শিশুর সব আচরণ মেনে নিতে হবে। বরং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, সেটিও বুঝিয়ে দিতে হবে।

শিশুকে শান্ত করতে কী করবেন?

আগে নিজে শান্ত থাকুন। শিশুর চিৎকারের জবাবে চিৎকার করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই কণ্ঠস্বর নিচু রাখুন, ধৈর্য ধরুন এবং তাকে নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করুন।

অনুভূতিটা বুঝতে চেষ্টা করুন। শিশু খেলনা না পেয়ে কাঁদলে বলতে পারেন, ‘তোমার খেলনাটা খুব পছন্দ হয়েছে, তাই না?’ এতে সে বুঝতে পারে, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রাগের মুহূর্তে বেশি বোঝাবেন না। শিশু যখন প্রচণ্ড উত্তেজিত, তখন দীর্ঘ ব্যাখ্যা কাজে নাও আসতে পারে। ছোট বাক্যে কথা বলুন, প্রয়োজন হলে তাকে কিছুটা সময় দিন।

সব আবদার মেনে নেবেন না। শিশুর কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া আর তার সব দাবি পূরণ করা এক বিষয় নয়। বিপজ্জনক কাজ করা বা অন্যকে আঘাত করার চেষ্টা করলে শান্তভাবেই তাকে থামাতে হবে।

শান্ত সময়ে শেখান। রাগের সময় ধীরে শ্বাস নেওয়া, সাহায্য চাওয়া কিংবা কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়ার মতো সহজ কৌশল শেখানো যায়। তবে প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি কাজ নাও করতে পারে।

রাগের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে

শিশু কেন বারবার রেগে যাচ্ছে, সেটিও খেয়াল করা জরুরি। ক্ষুধা, ঘুমের অভাব, শারীরিক অস্বস্তি, অতিরিক্ত শব্দ কিংবা দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন তার অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

তাই প্রতিবার কান্না শুরু হলে শুধু আচরণটি থামানোর চেষ্টা না করে, কী কারণে শিশুটি অস্বস্তিতে পড়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন।

এক্ষেত্রে মা-বাবার মানসিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুর কান্না ও চিৎকার সামলাতে গিয়ে অভিভাবকেরা ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়তে পারেন। তাই নিজেদের বিশ্রাম ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?

শিশুর রাগ বা জেদ বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক হতে পারে। তবে আচরণ যদি খুব ঘন ঘন ঘটে, দীর্ঘ সময় ধরে চলে, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে কিংবা নিজের বা অন্যের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

শুধু রাগ বা জেদ দেখেই কোনও বিকাশগত সমস্যা আছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শিশুর বয়স, আচরণের ধরন এবং অন্যান্য লক্ষণ বিবেচনা করেই বিশেষজ্ঞ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবেন।

লক্ষ্য শুধু কান্না থামানো নয়

শিশুর প্রতিটি রাগ বা কান্না সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়াই অভিভাবকের একমাত্র দায়িত্ব নয়। বরং তার অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করা, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং ধীরে ধীরে নিজের আবেগ সামলানোর দক্ষতা শেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই শেখার প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। কখনও শিশু সফল হবে, কখনও আবার রেগে যাবে। ধৈর্য ধরে একইভাবে পাশে থাকলে সে ধীরে ধীরে নিজের আবেগ চিনতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে পারে।

শিশুকে রাগ না করতে শেখানো নয়, বরং রাগের মধ্যেও কীভাবে নিজেকে সামলাতে হয়—সেটি শেখানোই অভিভাবকের আসল কাজ।

বিষয় : ফিচার মানসিক স্বাস্থ্য

বুড়িগঙ্গা

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


পছন্দের জিনিস না পেলেই কান্না, কথায় কথায় জেদ—কেন এমন করে শিশুরা?

প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দোকানে পছন্দের খেলনা কিনে দেওয়া হয়নি। ব্যস, মেঝেতে শুয়ে কান্না শুরু করল শিশু। কখনও চিৎকার, কখনও হাত-পা ছোড়া। মা-বাবা বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ধমক দিচ্ছেন। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত কান্না থামাতে শিশুর আবদারও মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল, আবারও একই ঘটনা।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবকের মনে প্রশ্ন জাগে, শিশুকে কি ঠিকভাবে শাসন করা হচ্ছে না? এত বোঝানোর পরও সে নিজের রাগ সামলাতে শিখছে না কেন?

শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোটদের এমন আচরণকে শুধু জেদ বা অবাধ্যতা হিসেবে দেখলে ভুল হতে পারে। কারণ, নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা এক দিনে তৈরি হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং মা-বাবার কাছ থেকে শিখতে শিখতেই শিশু ধীরে ধীরে এই দক্ষতা অর্জন করে।

মনোবিদরা বলছেন, শিশুকে শুধু শান্ত হতে বললেই হবে না; তাকে আবেগ সামলাতেও শেখাতে হবে।

রাগ হলেই কি শিশু অবাধ্য?

কোনও কিছু না পেলে বা মনের ইচ্ছা পূরণ না হলে ছোট শিশুরা সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই হতাশা কীভাবে সামলাতে হয়, তা তারা তখনও ভালোভাবে শেখেনি।

বড়রা মন খারাপ বা রাগ হলেও অনেক সময় নিজেদের সামলে নিতে পারেন। ছোটদের ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। ফলে রাগের মুহূর্তে তারা চিৎকার করতে পারে, কাঁদতে পারে কিংবা জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলতে পারে।

এর মানে এই নয় যে শিশুর সব আচরণ মেনে নিতে হবে। বরং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, সেটিও বুঝিয়ে দিতে হবে।

শিশুকে শান্ত করতে কী করবেন?

আগে নিজে শান্ত থাকুন। শিশুর চিৎকারের জবাবে চিৎকার করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই কণ্ঠস্বর নিচু রাখুন, ধৈর্য ধরুন এবং তাকে নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করুন।

অনুভূতিটা বুঝতে চেষ্টা করুন। শিশু খেলনা না পেয়ে কাঁদলে বলতে পারেন, ‘তোমার খেলনাটা খুব পছন্দ হয়েছে, তাই না?’ এতে সে বুঝতে পারে, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রাগের মুহূর্তে বেশি বোঝাবেন না। শিশু যখন প্রচণ্ড উত্তেজিত, তখন দীর্ঘ ব্যাখ্যা কাজে নাও আসতে পারে। ছোট বাক্যে কথা বলুন, প্রয়োজন হলে তাকে কিছুটা সময় দিন।

সব আবদার মেনে নেবেন না। শিশুর কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া আর তার সব দাবি পূরণ করা এক বিষয় নয়। বিপজ্জনক কাজ করা বা অন্যকে আঘাত করার চেষ্টা করলে শান্তভাবেই তাকে থামাতে হবে।

শান্ত সময়ে শেখান। রাগের সময় ধীরে শ্বাস নেওয়া, সাহায্য চাওয়া কিংবা কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়ার মতো সহজ কৌশল শেখানো যায়। তবে প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি কাজ নাও করতে পারে।

রাগের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে

শিশু কেন বারবার রেগে যাচ্ছে, সেটিও খেয়াল করা জরুরি। ক্ষুধা, ঘুমের অভাব, শারীরিক অস্বস্তি, অতিরিক্ত শব্দ কিংবা দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন তার অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

তাই প্রতিবার কান্না শুরু হলে শুধু আচরণটি থামানোর চেষ্টা না করে, কী কারণে শিশুটি অস্বস্তিতে পড়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন।

এক্ষেত্রে মা-বাবার মানসিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুর কান্না ও চিৎকার সামলাতে গিয়ে অভিভাবকেরা ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়তে পারেন। তাই নিজেদের বিশ্রাম ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?

শিশুর রাগ বা জেদ বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক হতে পারে। তবে আচরণ যদি খুব ঘন ঘন ঘটে, দীর্ঘ সময় ধরে চলে, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে কিংবা নিজের বা অন্যের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

শুধু রাগ বা জেদ দেখেই কোনও বিকাশগত সমস্যা আছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শিশুর বয়স, আচরণের ধরন এবং অন্যান্য লক্ষণ বিবেচনা করেই বিশেষজ্ঞ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবেন।

লক্ষ্য শুধু কান্না থামানো নয়

শিশুর প্রতিটি রাগ বা কান্না সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়াই অভিভাবকের একমাত্র দায়িত্ব নয়। বরং তার অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করা, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং ধীরে ধীরে নিজের আবেগ সামলানোর দক্ষতা শেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই শেখার প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। কখনও শিশু সফল হবে, কখনও আবার রেগে যাবে। ধৈর্য ধরে একইভাবে পাশে থাকলে সে ধীরে ধীরে নিজের আবেগ চিনতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে পারে।

শিশুকে রাগ না করতে শেখানো নয়, বরং রাগের মধ্যেও কীভাবে নিজেকে সামলাতে হয়—সেটি শেখানোই অভিভাবকের আসল কাজ।


বুড়িগঙ্গা

Buriganga Television is committed to delivering research-based, 
fact-driven, and impartial journalism on the geopolitical economy of the 
Indo-Pacific and the future of humanity to audiences worldwide.

Whatsapp: +8801321780900
Email: burigongatv@gmail.com
Newsroom: newsroom@burigongatv.com

স্বত্ব © বুড়িগঙ্গা মিডিয়া সেন্টার
পছন্দের জিনিস না পেলেই কান্না, কথায় কথায় জেদ—কেন এমন করে শিশুরা?
0:00 0:00
1.0x