জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে সাম্প্রতিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে নামমাত্র লিখিত পরীক্ষা নিয়ে আগে থেকেই ঠিক করা প্রার্থীদের ভাইভায় তোলা এবং দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে স্বজনপ্রীতি ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা মেধাবীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন পরীক্ষার্থীরা।
পরীক্ষার্থীদের দাবি, সকালে লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার পর দুপুর আড়াইটায় ভাইভা অনুষ্ঠিত হয় এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনজনের নাম চূড়ান্ত করা হয়। তাদের অভিযোগ, খাতার মূল্যায়ন হয়নি, এবং লিখিত পরীক্ষাটি কেবলমাত্র পছন্দের প্রার্থী টিকিয়ে রাখার জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি বিভাগের অনার্স-মাস্টার্সে প্রথম হওয়া শিক্ষার্থীদেরও ভাইভায় ডাকা হয়নি।
গত শুক্রবারের পরীক্ষায় অংশ নেন ৩৮ জন প্রার্থী। এদের মধ্যে সাজেদা আক্তার, মো. আতিক হাসান, ইকরামুল হাসান, মাসুম বিল্লাহ পাটোয়ারী, মুহাম্মদ আছরারুল হাছানাত, মো. তুহিন আহমেদ, সানিয়া আক্তার তুষা, হেলাল উদ্দিন, উম্মে হাবীবা ও মো. শাহিনুর রহমান, এই ১০ জনকে ভাইভায় ডাকা হয়। পরীক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন মাত্র ১০ জনকে ভাইভায় তোলা হলো, তার ব্যাখ্যা কোথাও দেওয়া হয়নি।
আরও গুরুতর অভিযোগ এসেছে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সাতজন হিন্দু প্রার্থীর কেউ উত্তীর্ণ না হওয়া নিয়ে। বাদ পড়াদের মধ্যে রয়েছেন অর্থনীতি বিভাগেরই প্রথম স্থান অর্জনকারী মিতু রানী রায় যার অনার্স-মাস্টার্সে সিজিপিএ ছিল যথাক্রমে ৩.৯০ ও ৩.৯২, পাশাপাশি দুটি গবেষণাপত্রও রয়েছে। মেধাবী হয়েও ভাইভা ডাক না পাওয়ায় পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বাড়ে। অন্যদিকে উত্তীর্ণ কিছু প্রার্থীর একাডেমিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে কম বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. আজম খানের আচরণ নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। তাদের দাবি, পরীক্ষার সময় তিনি নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীর প্রতি নমনীয় ছিলেন। তবে অধ্যাপক আজম খান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা কয়েকজন শিক্ষক মিলে প্রশ্ন তৈরি করেছি, খাতা মূল্যায়ন করেছি। পক্ষপাতের কোনো সুযোগ নেই।”
নিয়োগ বোর্ডে ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম, ট্রেজারার অধ্যাপক সাবিনা শরমীন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সানজিদা ফারহানা, চেয়ারম্যান অধ্যাপক শরীফ মোশাররফ হোসেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম—যিনি উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এই উপস্থিতিও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদা ইসলাম বলেন, “আমি অনার্স-মাস্টার্সে প্রথম, লিখিত পরীক্ষাও ভালো দিয়েছি। তবুও আমাকে ভাইভায় ডাকেনি। আগে থেকেই যদি তালিকা ঠিক থাকে, তাহলে পরীক্ষা নেওয়ার দরকার কী?”
জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. রইছ উদ্দিন বলেন, “যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে এবং শিক্ষক সমিতির কেউ তাতে জড়িত থাকেন, অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অস্বচ্ছতা বরদাস্ত করা হবে না।”
উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “মানুষ অনেক কথা বলবে। আমরা স্বচ্ছ প্রক্রিয়াতেই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছি।”
এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে প্রভাষক নিয়োগকে ঘিরে স্বজনপ্রীতি, পূর্বনির্ধারিত তালিকা, নির্দিষ্ট প্রার্থীদের অগ্রাধিকার এবং বোর্ড সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছিল। তখনও পরীক্ষার্থীরা ভাইভা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, খাতা মূল্যায়নের অসামঞ্জস্য এবং মেধাবীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলেছিলেন। অর্থনীতি বিভাগের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই ধারাবাহিক অনিয়মের পুনরাবৃত্তি বলেই মনে করছেন অনেকে।

