ঢাকা    সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
বুড়িগঙ্গা

অনলাইন বে/টিং/য়ে/র আসল ফাঁদ কী, জানলে অবাক হবেন!



অনলাইন বে/টিং/য়ে/র আসল ফাঁদ কী, জানলে অবাক হবেন!
প্রতীকী ছবি/এআই

খেলার ফল কী হবে, তা নিয়ে বাজি ধরেছেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফল জানা গেল। কখনও জিতলেন, কখনও হারলেন। মনে হলো, আরেকবার চেষ্টা করলে হয়তো এবার জিতবেন। এভাবে ছোট অঙ্কের বাজি ধরতে ধরতে কখন যে বারবার বেটিং করার অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।

অনলাইন স্পোর্টস বেটিংয়ের জগতে এমনই এক প্রবণতা হলো ‘মাইক্রো-বেটিং’। এতে পুরো ম্যাচের ফলের বদলে খেলার ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে বাজি ধরা হয়। যেমন, ক্রিকেটে পরের বলটি স্ট্রাইক হবে, নাকি বল—এমন ঘটনা নিয়েও বাজি ধরা যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফল জানা যায় বলে অল্প সময়েই বারবার বাজি ধরার সুযোগ তৈরি হয়। আর এই দ্রুতগতির চক্রই জুয়ার প্রতি আসক্তির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোচনায় দেখা যায়, এ ধরনের বেটিংয়ের আকর্ষণ শুধু টাকা জেতার সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মস্তিষ্কের পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশা, উত্তেজনা এবং ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক।

জেতার আগেই মস্তিষ্কে উত্তেজনা

ডোপামিনকে প্রায়ই আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এটি শুধু আনন্দ অনুভব করার বিষয় নয়; প্রেরণা, প্রত্যাশা ও পুরস্কার পাওয়ার তাগিদ তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। বাজি ধরার ক্ষেত্রে ফল জানার আগের মুহূর্তটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ।

কোনও বাজিতে জিতবেন কিনা, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। এই অনিশ্চয়তাই পরের ফল জানার আগ্রহ বাড়াতে পারে। কখনও জেতা, কখনও হারা—এভাবে অনিয়মিত পুরস্কার পাওয়ার অভিজ্ঞতা মানুষকে আবার চেষ্টা করতে উৎসাহিত করতে পারে।

মাইক্রো-বেটিংয়ে এই চক্র খুব দ্রুত ঘটে। একটি বাজির ফল জানার পরপরই আরেকটি বাজি ধরার সুযোগ আসে। ফলে জেতার প্রত্যাশা, উত্তেজনা ও আবার চেষ্টা করার তাগিদ বারবার তৈরি হতে পারে। একসময় কেউ কেউ খেলাটি উপভোগ করার চেয়ে বাজি ধরার প্রক্রিয়াটির প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন?

জুয়া খেলার অভ্যাস সমস্যায় পরিণত হলে মস্তিষ্কের পুরস্কারপ্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত ব্যবস্থাগুলো প্রভাবিত হতে পারে। পুরস্কারপ্রাপ্তির সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশ আরও তীব্র উত্তেজনা খুঁজতে পারে। অপরদিকে, পরিকল্পনা করা, ঝুঁকি বিবেচনা করা ও তাৎক্ষণিক তাগিদ সামলানোর ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

এর ফলে কেউ আগের মতো উত্তেজনা পেতে ক্রমে বেশি টাকা বাজি ধরতে পারেন। হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় আবার বাজি ধরতে পারেন। এমনকি ক্ষতির কথা বুঝতে পারলেও খেলা থামানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এই অভ্যাসের প্রভাব অর্থনৈতিক ক্ষতির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, কাজ কিংবা পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাজির পরিমাণ বা সময় নিয়ে মিথ্যা বলা, খেলা কমানোর চেষ্টা করলে অস্থিরতা অনুভব করা এবং ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বারবার ফিরে যাওয়াও সমস্যাজনক জুয়া খেলার লক্ষণ হতে পারে।

কীভাবে বেরিয়ে আসবেন এই চক্র থেকে?

অনলাইন বেটিংয়ের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিজেকে দোষারোপ করাই সমাধান নয়। বরং কোন পরিস্থিতিতে বাজি ধরার তাগিদ বাড়ে, কোন আবেগের সময় বেশি বেটিং করা হয় এবং কীভাবে সেই তাগিদ সামলানো যায়—তা বোঝা জরুরি।

মনোবিজ্ঞানের একটি পদ্ধতি হলো কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি)। এর মাধ্যমে বাজি ধরার পেছনে কাজ করা চিন্তা, আবেগ ও আচরণের ধরন শনাক্ত করে সেগুলো পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। জুয়া-আসক্তি থেকে সেরে ওঠা মানুষের সহায়তা গোষ্ঠীও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি, উৎসাহ ও জবাবদিহির সুযোগ দিতে পারে। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

পাশাপাশি বেটিং অ্যাপ থেকে দূরে থাকা, বাজি ধরার সুযোগ সীমিত করা এবং যে পরিস্থিতিগুলো তাগিদ বাড়ায় সেগুলো এড়িয়ে চলার মতো পদক্ষেপও সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের বা গুরুতর আসক্তির ক্ষেত্রে শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর না করে পেশাদার সহায়তা নেওয়া ভালো।

স্নায়ুবিজ্ঞানী নিকোল এ. তেত্রো তার একটি লেখায় ব্যাখ্যা করেছেন, মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীলতার ক্ষমতার কারণে আচরণের পুরোনো ধরন বদলে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য সময়, ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও যথাযথ সহায়তা প্রয়োজন।

ছোট অঙ্কের বাজি মানেই যে কেউ আসক্ত হয়ে পড়বেন, তা নয়। কিন্তু অল্প সময়ে বারবার বাজি ধরার সুযোগ, অনিশ্চিত পুরস্কারের প্রত্যাশা এবং হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার তাগিদ মিলে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই বাজি ধরার অভ্যাস যখন অর্থ, সম্পর্ক কিংবা দৈনন্দিন জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে শুরু করে, তখন সেটিকে নিছক বিনোদন ভেবে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।

বিষয় : ফিচার মানসিক স্বাস্থ্য

বুড়িগঙ্গা

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


অনলাইন বে/টিং/য়ে/র আসল ফাঁদ কী, জানলে অবাক হবেন!

প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

খেলার ফল কী হবে, তা নিয়ে বাজি ধরেছেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফল জানা গেল। কখনও জিতলেন, কখনও হারলেন। মনে হলো, আরেকবার চেষ্টা করলে হয়তো এবার জিতবেন। এভাবে ছোট অঙ্কের বাজি ধরতে ধরতে কখন যে বারবার বেটিং করার অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।

অনলাইন স্পোর্টস বেটিংয়ের জগতে এমনই এক প্রবণতা হলো ‘মাইক্রো-বেটিং’। এতে পুরো ম্যাচের ফলের বদলে খেলার ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে বাজি ধরা হয়। যেমন, ক্রিকেটে পরের বলটি স্ট্রাইক হবে, নাকি বল—এমন ঘটনা নিয়েও বাজি ধরা যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফল জানা যায় বলে অল্প সময়েই বারবার বাজি ধরার সুযোগ তৈরি হয়। আর এই দ্রুতগতির চক্রই জুয়ার প্রতি আসক্তির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোচনায় দেখা যায়, এ ধরনের বেটিংয়ের আকর্ষণ শুধু টাকা জেতার সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মস্তিষ্কের পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশা, উত্তেজনা এবং ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক।

জেতার আগেই মস্তিষ্কে উত্তেজনা

ডোপামিনকে প্রায়ই আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এটি শুধু আনন্দ অনুভব করার বিষয় নয়; প্রেরণা, প্রত্যাশা ও পুরস্কার পাওয়ার তাগিদ তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। বাজি ধরার ক্ষেত্রে ফল জানার আগের মুহূর্তটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ।

কোনও বাজিতে জিতবেন কিনা, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। এই অনিশ্চয়তাই পরের ফল জানার আগ্রহ বাড়াতে পারে। কখনও জেতা, কখনও হারা—এভাবে অনিয়মিত পুরস্কার পাওয়ার অভিজ্ঞতা মানুষকে আবার চেষ্টা করতে উৎসাহিত করতে পারে।

মাইক্রো-বেটিংয়ে এই চক্র খুব দ্রুত ঘটে। একটি বাজির ফল জানার পরপরই আরেকটি বাজি ধরার সুযোগ আসে। ফলে জেতার প্রত্যাশা, উত্তেজনা ও আবার চেষ্টা করার তাগিদ বারবার তৈরি হতে পারে। একসময় কেউ কেউ খেলাটি উপভোগ করার চেয়ে বাজি ধরার প্রক্রিয়াটির প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন?

জুয়া খেলার অভ্যাস সমস্যায় পরিণত হলে মস্তিষ্কের পুরস্কারপ্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত ব্যবস্থাগুলো প্রভাবিত হতে পারে। পুরস্কারপ্রাপ্তির সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশ আরও তীব্র উত্তেজনা খুঁজতে পারে। অপরদিকে, পরিকল্পনা করা, ঝুঁকি বিবেচনা করা ও তাৎক্ষণিক তাগিদ সামলানোর ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

এর ফলে কেউ আগের মতো উত্তেজনা পেতে ক্রমে বেশি টাকা বাজি ধরতে পারেন। হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় আবার বাজি ধরতে পারেন। এমনকি ক্ষতির কথা বুঝতে পারলেও খেলা থামানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এই অভ্যাসের প্রভাব অর্থনৈতিক ক্ষতির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, কাজ কিংবা পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাজির পরিমাণ বা সময় নিয়ে মিথ্যা বলা, খেলা কমানোর চেষ্টা করলে অস্থিরতা অনুভব করা এবং ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বারবার ফিরে যাওয়াও সমস্যাজনক জুয়া খেলার লক্ষণ হতে পারে।

কীভাবে বেরিয়ে আসবেন এই চক্র থেকে?

অনলাইন বেটিংয়ের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিজেকে দোষারোপ করাই সমাধান নয়। বরং কোন পরিস্থিতিতে বাজি ধরার তাগিদ বাড়ে, কোন আবেগের সময় বেশি বেটিং করা হয় এবং কীভাবে সেই তাগিদ সামলানো যায়—তা বোঝা জরুরি।

মনোবিজ্ঞানের একটি পদ্ধতি হলো কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি)। এর মাধ্যমে বাজি ধরার পেছনে কাজ করা চিন্তা, আবেগ ও আচরণের ধরন শনাক্ত করে সেগুলো পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। জুয়া-আসক্তি থেকে সেরে ওঠা মানুষের সহায়তা গোষ্ঠীও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি, উৎসাহ ও জবাবদিহির সুযোগ দিতে পারে। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

পাশাপাশি বেটিং অ্যাপ থেকে দূরে থাকা, বাজি ধরার সুযোগ সীমিত করা এবং যে পরিস্থিতিগুলো তাগিদ বাড়ায় সেগুলো এড়িয়ে চলার মতো পদক্ষেপও সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের বা গুরুতর আসক্তির ক্ষেত্রে শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর না করে পেশাদার সহায়তা নেওয়া ভালো।

স্নায়ুবিজ্ঞানী নিকোল এ. তেত্রো তার একটি লেখায় ব্যাখ্যা করেছেন, মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীলতার ক্ষমতার কারণে আচরণের পুরোনো ধরন বদলে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য সময়, ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও যথাযথ সহায়তা প্রয়োজন।

ছোট অঙ্কের বাজি মানেই যে কেউ আসক্ত হয়ে পড়বেন, তা নয়। কিন্তু অল্প সময়ে বারবার বাজি ধরার সুযোগ, অনিশ্চিত পুরস্কারের প্রত্যাশা এবং হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার তাগিদ মিলে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই বাজি ধরার অভ্যাস যখন অর্থ, সম্পর্ক কিংবা দৈনন্দিন জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে শুরু করে, তখন সেটিকে নিছক বিনোদন ভেবে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।


বুড়িগঙ্গা

Buriganga Television is committed to delivering research-based, 
fact-driven, and impartial journalism on the geopolitical economy of the 
Indo-Pacific and the future of humanity to audiences worldwide.

Whatsapp: +8801321780900
Email: burigongatv@gmail.com
Newsroom: newsroom@burigongatv.com

স্বত্ব © বুড়িগঙ্গা মিডিয়া সেন্টার
অনলাইন বে/টিং/য়ে/র আসল ফাঁদ কী, জানলে অবাক হবেন!
0:00 0:00
1.0x