বরিশালের বানারীপাড়া ও উজিরপুর উপজেলায় মাদক কারবার, হুমকি-ধমকি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে আলোচনায় উঠে এসেছেন জাকির বালি (৫০) নামে এক ব্যক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে এক ব্যক্তিকে প্রাণনাশের হুমকি, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ এবং থানায় করা মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী জিয়াউর রহমান (৪২) বানারীপাড়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে সরবরাহ করা নথিতে উল্লেখ রয়েছে।অভিযোগকারীর দাবি, এলাকায় মাদক কারবারের প্রতিবাদ করায় দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সঙ্গে জাকির বালির বিরোধ চলে আসছিল। এর মধ্যে উজিরপুর থানায় সিসি ক্যামেরা চুরির ঘটনায় মামলা করার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই মামলায় জাকির বালির ছেলেকে আসামি করা এবং তাঁর গ্রেপ্তারের পর মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জিয়াউর রহমান।এ ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—মামলা তুলে নিতে সত্যিই কি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে? এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? আর অভিযোগগুলোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং মামলার নথি যাচাই।
জিডিতে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ
সরবরাহ করা নথি অনুযায়ী, গত ৩১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বানারীপাড়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন জিয়াউর রহমান। নথিতে জিডি নম্বর ১৩২৩ এবং ট্র্যাকিং নম্বর SANT41 উল্লেখ রয়েছে।
জিডির বিবরণে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে বানারীপাড়া থানার আওয়ার এলাকায় নিজের বসতবাড়ির সামনে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে জাকির বালির কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় পূর্বের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগ তোলা হয়েছে।জিয়াউর রহমানের দাবি, তিনি গালিগালাজ করতে নিষেধ করলে জাকির বালি তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন। পাশাপাশি তাঁকে নিজের বসতঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে জিডিতে উল্লেখ রয়েছে।অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, ঘটনাটি কয়েকজন ব্যক্তির উপস্থিতিতে ঘটেছে। জিডিতে সম্ভাব্য সাক্ষী হিসেবে মো. শাহ আলম বালি, মো. নজরুল ইসলাম, রাবেয়া বেগম ও মো. নুর আলমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের বক্তব্য ও পুলিশের তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।জিয়াউর রহমানের অভিযোগ, উজিরপুর থানাধীন তাঁর বসতবাড়ির একটি ভবনে স্থাপিত সিসি ক্যামেরা চুরি হয়ে যায়। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে উজিরপুর থানায় মামলা করেন।সরবরাহ করা জিডিতে মামলাটির নম্বর ২২ এবং তারিখ ৩০ অক্টোবর ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মামলায় জাকির বালির ছেলেকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে এবং তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর জাকির বালি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বলে দাবি করেছেন অভিযোগ কারী।জিয়াউর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার পর থেকেই তাঁকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর সকালে বাড়ির সামনে এসে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।তবে মামলার এজাহার, আসামি গ্রেপ্তারের তথ্য এবং তদন্তের বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট থানা থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। মামলায় আসামি হওয়া কিংবা গ্রেপ্তার হওয়াই অপরাধ প্রমাণের সমতুল্য নয়।মাদক কারবারের অভিযোগে উদ্বেগ,জিয়াউর রহমানের অভিযোগ, জাকির বালি এলাকায় মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত এবং এর প্রতিবাদ করায় তাঁকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, মাদক কারবারের বিস্তার স্থানীয় তরুণদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোথায় মাদক বিক্রি হচ্ছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এ বিষয়ে আগে কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাইয়ের দাবি রাখে।তবে জাকির বালির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা মামলা বা আদালতের নথি এই মুহূর্তে হাতে নেই। ফলে তাঁকে মাদক ব্যবসায়ী কিংবা মাদক কারবারের মূল হোতা হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।অপরাধজগতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ,অভিযোগকারীর দেওয়া বক্তব্যে জাকির বালির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগও তোলা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর প্রভাব এবং কথিত অপরাধ-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে দাবি করা হলে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর নম্বর, অভিযোগের ধরন, তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের রায় যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ, গ্রেপ্তার, বিচারাধীন মামলা ও দণ্ডিত হওয়ার বিষয়গুলো এক নয়।এ কারণে জাকির বালির বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করে আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণ,অভিযোগকারীর বক্তব্যে অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।রাজনৈতিক পরিচয় বা যোগাযোগের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধের পৃষ্ঠপোষক বলা যায় না। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে নির্দিষ্ট ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সামনে আনা প্রয়োজন।প্রতিবাদ করলেই কি হুমকির মুখে পড়তে হবে?’একজন নাগরিক অপরাধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি প্রাণনাশের হুমকি বা ভয়ভীতির শিকার হন, তাহলে বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।জিয়াউর রহমানের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে অভিযোগের কোনো অংশ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ও সুনামও সুরক্ষিত রাখতে হবে।এ ঘটনায় জিডিতে উল্লেখ করা সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ, সিসি ক্যামেরা চুরির মামলার নথি পর্যালোচনা এবং হুমকির অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা।পুলিশের তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত ঘটনা,ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বানারীপাড়া ও উজিরপুর থানা পুলিশের কাছে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। জিয়াউর রহমানের জিডির বিষয়ে কোনো তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, সিসি ক্যামেরা চুরির মামলার বর্তমান অবস্থা কী, কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না এবং এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশের কাছে কী তথ্য রয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।পাশাপাশি অভিযোগকারীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা সম্ভব।এখন দেখার বিষয়, জিয়াউর রহমানের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অভিযোগ সত্য হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকারও রক্ষা করতে হবে।