পুরান ঢাকার সরু গলি, শতবর্ষী স্থাপনা আর আড্ডার সংস্কৃতির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে বহু ইতিহাস। সেই ইতিহাসেরই এক সুস্বাদু অধ্যায় ‘নিউ ক্যাফে কর্নার’। প্রায় সাড়ে ছয় দশক ধরে একই স্বাদ, একই ঐতিহ্য আর পুরোনো দিনের আবহ ধরে রেখে রেস্তোরাঁটি আজও নাশতা ও হালকা খাবারপ্রেমীদের অন্যতম গন্তব্য। বিশেষ করে এর বিখ্যাত ‘ক্রাম চাপ’ খেতে প্রতিদিনই ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ।
রেস্তোরাঁয় ঢুকলেই যেন মনে হয়, সময় কয়েক দশক পেছনে ফিরে গেছে। ছয়-সাতটি টেবিল আর লোহার রডের পুরোনো চেয়ারগুলো আজও বহন করছে অতীতের ছাপ। আধুনিক রেস্তোরাঁর চাকচিক্য না থাকলেও জায়গাটির প্রতিটি কোণজুড়ে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের আবহ। প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে প্রবীণ ও নবীনের মেলবন্ধন কেউ নাশতায়, কেউ আবার জমিয়ে আড্ডায় ব্যস্ত।
পটুয়াটুলীর নর্থব্রুক হল রোডের ২৮ নম্বর ভবনে অবস্থিত নিউ ক্যাফে কর্নারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬২ সালে। প্রতিষ্ঠাতা হরিপদ ঘোষ প্রথমদিকে পরোটা ও ডাল দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও পরে যুক্ত হয় কাটলেট, ক্রাম্ব চাপ, আলুর চপসহ বিভিন্ন খাবার। সময়ের সঙ্গে মেন্যু বিস্তৃত হলেও শুরু থেকেই থাকা জনপ্রিয় কয়েকটি আইটেমের স্বাদ আজও অপরিবর্তিত রয়েছে বলে দাবি ক্রেতাদের।
রেস্তোরাঁটির সবচেয়ে পরিচিত খাবার ক্রাম চাপ। খাসির কিমার সঙ্গে বিশেষ উপায়ে বিস্কুটের গুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি এই খাবার ডুবোতেলে ভেজে পরিবেশন করা হয় গরম পাউরুটির সঙ্গে। অনেকের মতে, ব্রিটিশ আমলের খাদ্যসংস্কৃতির প্রভাব থেকেই এই খাবারটির প্রচলন। নিউ ক্যাফে কর্নারে ক্রাম্ব চাপ তৈরির প্রচলন শুরু করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম রাঁধুনি জোসেফ গোমেজ। তার কাছ থেকেই কাজ শিখেছিলেন জন গোমেজ, যিনি পরবর্তীতে প্রায় ২৬ বছর এই রেস্তোরাঁয় ‘কারিগর’ বা প্রধান রাঁধুনি হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘদিনের সেই ধারাবাহিকতাই আজও ধরে রাখা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে এক প্লেট ক্রাম চাপের দাম ২০০ টাকা। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, একসময় এই খাবারের দাম ছিল মাত্র দুই টাকা। সময়ের সঙ্গে কাঁচামালের দাম বাড়ায় খাবারটির মূল্যও কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। মালিকপক্ষের ভাষ্য, বর্তমানে খাসির মাংসের মূল্য বেশি হওয়ায় আগের দাম ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
ছোট পরিসরের এই রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে প্রায় ২৪ জনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। পুরোনোক ধাঁচের চেয়ার-টেবিল আর সাদামাটা পরিবেশ এখনো ধরে রেখেছে আগেকার দিনের কেবিন রেস্তোরাঁর আবহ।
সকালের নাশতায় এখানে ২০ টাকায় পাওয়া যায় পরোটা-ভাজি বা ডাল। সাধারণ চায়ের দাম ২০ টাকা এবং স্পেশাল চা ২৫ টাকা। ডিম পাওয়া যায় ২০ টাকায়, আর খাসির ভুনার দাম ১০০ টাকা। বিকেলের নাশতায় ক্রাম চাপ ছাড়াও রয়েছে চিকেন ফ্রাই ১১০ টাকা, মোগলাই ৮০ টাকা, কাটলেট ৫০ টাকা এবং আলুর চপ ২০ টাকা। দীর্ঘদিনের ক্রেতাদের মতে, সময়ের সঙ্গে দাম বেড়েছে, কিন্তু খাবারের স্বাদে তেমন পরিবর্তন আসেনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় পুরান ঢাকার সাহিত্য ও প্রকাশনা অঙ্গনের অনেক মানুষ নিয়মিত আড্ডা দিতেন এই রেস্তোরাঁয়। বাংলাবাজারের প্রকাশনা ব্যবসার কেন্দ্র হওয়ায় এটি ছিল লেখক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিকর্মীদের পরিচিত মিলনস্থল। লোকমুখে প্রচলিত আছে, কবি জসীমউদ্দীন ও শামসুর রাহমানের মতো গুণীজনও একসময় এখানে আসতেন।
রেস্তোরাঁয় খেতে আসা মিজানুর বিজু বলেন, ক্লাস ওয়ান থেকে আমি এখান থেকেই খাই। এখানকার চা এবং ক্রাম চাপ অনেক নামকরা। স্থানীয়রা ছাড়াও অনেক দূর থেকে এখানে ভোজনরসিকরা খেতে আসেন। বাজারের তুলনায় এখানে খাবারের দাম খুব বেশি না।
প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে নিউ ক্যাফে কর্নার। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা দূর-দূরান্ত থেকে আসা খাবারপ্রেমী সবার কাছেই এটি এখনও পুরান ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় নাশতার ঠিকানা।
নিউ ক্যাফে কর্নারের বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, “এটি শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, পুরান ঢাকার খাদ্যঐতিহ্যের অংশ। আমরা চেষ্টা করি প্রতিষ্ঠানের পুরোনো স্বাদ ও পরিবেশ যতটা সম্ভব ধরে রাখতে। অনেক ক্রেতা আছেন, যারা ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এখানে খেতে এসেছেন, এখন নিজের সন্তানদের নিয়েও আসেন। তাদের এই ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
সময়ের পরিবর্তনে চারপাশের অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু পুরান ঢাকার এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নিউ ক্যাফে কর্নার এখনো ধরে রেখেছে তার পুরোনো রেসিপি, পরিচিত স্বাদ এবং কয়েক প্রজন্মের স্মৃতিকে। তাই এটি শুধু একটি রেস্তোরাঁ নয়, বরং পুরান ঢাকার খাদ্যঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী।