"শুদ্ধ সংস্কৃতির মশাল জ্বেলে ঘুচিয়ে দেবো সকল অন্ধকার"—এই প্রত্যয় নিয়ে আজ থেকে ঠিক ২২ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল একটি সংগঠন। সময়টা ২০০৪ সাল। যখন অপসংস্কৃতির প্রাবল্যে তরুণ সমাজ দিশেহারা, ঠিক তখনই মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার মশাল নিয়ে হাজির হয় বাংলার প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ ঢাকা কলেজের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন 'সওগাত সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ'। ক্যাম্পাসের আঙিনায় শুরু হওয়া সেই ছোট প্রয়াসটি আজ দুই দশকের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চায় এক অনন্য বাতিঘরে পরিণত হয়েছে।
অপসংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে মানবিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সওগাত কাজ করে যাচ্ছে বহুমুখী মাধ্যমে। বর্তমানে সংগঠনটিতে ৭টি স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে—সংগীত, শিশু-কিশোর, থিয়েটার, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, ক্বেরাত ও শিল্প বিভাগ। প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলা হয়, যেখানে মেন্টর হিসেবে ক্লাস নেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত শিল্পীরা। বর্তমানে ঢাকা কলেজের আঙিনা ছাড়িয়ে সওগাতের অধীনে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত সংগীত, আবৃত্তি ও নাট্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, যাদের মধ্যে সক্রিয় কর্মী হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন ৮০ থেকে ১০০ জন তরুণ।
বিগত দুই দশকে দেশীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহু গুণী শিল্পী উপহার দিয়েছে সওগাত। প্রখ্যাত নাশিদ শিল্পী মোনায়িম বিল্লাহ (যাঁর ‘মেহেরবান’ নাশিদটি দেশজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়) সওগাতেরই সৃষ্টি। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, "সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমার পথচলা সওগাতের মাধ্যমেই শুরু হয়েছে। এই সংগঠন আমার শৈল্পিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।"
মোনায়িম বিল্লাহ ছাড়াও সওগাতের হাত ধরে উঠে এসেছেন প্রখ্যাত নাট্যকার ও পরিচালক আবু সাঈদ খান, বিশিষ্ট নাট্য অভিনেতা মেহেদী হাসান মেধা, আবু সাঈদ স্বরণ এবং বিটিভির নিয়মিত উপস্থাপক ও গবেষক এম তারিক হাসিব। এ ছাড়া দেশের অন্যতম শীর্ষ কাওয়ালি দল 'কাসিদা'র সদস্য নাশিদ শিল্পী মো. ইমাম হোসাইন এবং একুশে টেলিভিশনের 'সেরাদের সেরা' প্রতিযোগিতায় বিজয়ী আবৃত্তি শিল্পী ও পরিচালক এম. সাব্বির আহমেদও এই সংগঠনেরই তৈরি কর্মী।
পথনাটক, উন্মুক্ত গানের আড্ডা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, কবি-সাহিত্যিকদের জন্য দোয়া মাহফিল এবং শীতবস্ত্র বিতরণের মতো সামাজিক কাজও তারা করে আসছে নিয়মিত। পহেলা বৈশাখে রমনা পার্কের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিশেষ আয়োজন কিংবা শাহবাগের উন্মুক্ত মঞ্চ—সবখানেই রয়েছে সওগাতের পদচারণা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা কলেজে সওগাতের সমন্বয়ে আয়োজিত বৃহৎ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান 'ভয়কে করো জয়' শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সওগাত বেশ সক্রিয়। তাদের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল ‘Sawgat TV’ ও ফেসবুক পেজে নিয়মিত প্রকাশ পায় মৌলিক কাজ। ইতিমধ্যেই 'তুমি যে মহান', 'মুখরিত নব সওগাত' এবং 'দিদার দাও আমায়'-এর মতো জনপ্রিয় অ্যালবাম ও নাশিদ শ্রোতাদের উপহার দিয়েছে তারা। গত ঈদুল ফিতরে প্রকাশিত সওগাতের বিশেষ শর্টফিল্ম 'হাসি' বেশ প্রশংসিত হয়েছে। বর্তমানে মানবিক বোধ নিয়ে নতুন একটি শর্টফিল্মের নির্মাণকাজও এগিয়ে চলেছে জোরকদমে।
সওগাতের অন্যতম সুন্দর একটি দিক হলো এর 'শিশু-কিশোর বিভাগ'। ঢাকা শহরের প্রায় শতাধিক শিশু অনলাইন ও অফলাইনে সওগাতের এই বিশেষ বিভাগে আবৃত্তি, সংগীত, নৈতিক শিক্ষা ও চিত্রাঙ্কনের প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। শিশুদের মেধা বিকাশের এই উদ্যোগ নিয়ে সংগঠনের সংগঠনটির উপদেষ্টা জাকির হোসাইনের ভাষায়, "সংস্কৃতি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি জাতির আত্মার খোরাক। সওগাত শুধু গান-কবিতা শেখাচ্ছে না, বরং একজন মানুষের ভেতরের মানবিকতাকে জাগিয়ে তুলছে।"
চেয়ারম্যান মুস্তাকিম আহমেদ বলেন, "একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আজকের শিশুদের ওপর। আমরা তাদের হাতে অপসংস্কৃতির পরিবর্তে সুস্থ সংস্কৃতির সওগাত তুলে দিতে চাই।"
অন্যদিকে সওগাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এর বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ আলী দোহা। তিনি জানান, "আমার স্বপ্ন, সওগাত একদিন মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সাহিত্য-সংস্কৃতির শক্তিশালী একটি প্ল্যাটফর্ম হবে। নৈতিকতাসম্পন্ন নাটক, শর্টফিল্ম ও সংগীতের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাতে আমরা ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ কালচারাল ইনস্টিটিউট ও নিজস্ব স্টুডিও প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছি।"
ইনসাফ সাংস্কৃতিক সংসদ, গুঞ্জরন শিল্পকেন্দ্র ও ইল্লিউন কালচারাল একাডেমির মতো উপশাখাগুলোকে সাথে নিয়ে ঢাকা কলেজের বুক চিরে সওগাত সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ তরুণ প্রজন্মের মগজে ও মননে যে সুস্থ ধারার বীজ বুনে চলেছে, তা আগামী দিনে এক বিশাল মহীরুহ হয়ে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আগলে রাখবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।