সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানার ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা সেলিম রেজার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাপক অনিয়ম এবং ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ঘুষের টাকার লালসায় নিজের মূল কর্মস্থলে ঠিকমতো সময় না দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদকে অনিয়মের আখড়ায় পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা। এছাড়া তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, তিনি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর তার বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর থানায় মামলা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাসেকখানেক আগে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা সেলিম রেজার মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সাভার উপজেলার ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ লাভকরেছেন। এর আগে তিনি উপজেলার বনগাঁও ইউনিয়নের প্রশাসক ছিলেন। কিন্তু বনগাঁও ইউনিয়নে শিল্পকারখানা নাই বিধায় উপোরী আয়ও ভালো না। তাই অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিপ্রায়ে কর্তপক্ষকে ম্যানেজ করে ইয়ারপুর ইউনিয়নের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক সেলিম রেজা দীর্ঘ ৫/৬ বছর ধরে সাভারে চাকুরী করেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শাসন আমলে তাকে একাধিকবার বদলী করা হলেও কয়েকদিনে পরে আবার ফিরে আসেন। অনেক সময় তদবির করে বদলীর আদেশ প্রত্যাহার করেছেন।
তিনি বনগাঁও ইউনিয়নের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রহস্যজনক কারণে সম্প্রতি এই ঘুষখোর ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতাকারীকে বিএনপি নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মো: সালাউদ্দিন বাবুর নিজ ইউনিয়ন ইয়ারপুরে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়।
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা সেলিম রেজার বিরুদ্ধে দুর্নীতির আরও অভিযোগ, তিনি তার অফিসের ঝাড়ুদারের বেতন ১৫শ' টাকা। কিন্তু ঝাড়ুদারকে মাত্র ৫শ' টাকা দিয়ে বাকী ১ হাজার টাকা নিজের পকেটস্থ করতেন। অডিটে বিষয়টি ধরা খাওয়ার পর তাকে চরমভাবে ভৎর্সনা করা হয়।
এছাড়া সেলিম রেজা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তার সহকর্মীদের সম্মানী অনেক কম দিয়ে নিজে পকেটস্থ করেন। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে তার সহকর্মীরা অভিযোগ করলে সেখানেও তিনি ভৎর্সনার শিকার হন।
জানা গেছে, উপজেলার নাইগার্ডদের সঙ্গে প্রায়শই দুর্ব্যবহার করলে একদিন এক নাইটগার্ড ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে মারধর করে।
অভিযোগ রয়েছে, ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সেবামূলক কাজের চেয়ে নানা উপায়ে অর্থ আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন প্রশাসক সেলিম রেজা। সম্প্রতি তাঁর অফিস কক্ষে বসে ঘুষের টাকা গণনার একটি ছবি এলাকায় আলোচনার ঝড় তুলেছে। দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জামগড় এলাকার কয়েকজন মুদি দোকান মালিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, আগে প্রতিবছর আমাদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে ৫০০ থেকে ৬০০শ টাকা লাগতো। এখন ট্রেড লাইসেন্স করতে গেলে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা নিচ্ছে। কিন্তু তারা ২০০/২৫০ টাকার রশিদ হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে।
এদিকে প্রধান কার্যালয় ও নির্ধারিত কর্মস্থল সাভার উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে নিয়মিত অফিস করার কথা থাকলেও ঘুষ ও দুর্নীতির নগদ টাকার লোভে তিনি সেখানে সপ্তাহে মাত্র একদিনও ঠিকমতো সময় দেন না বলে জানা গেছে। ফলে একদিকে যেমন পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ মানুষও নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাভার উপজেলা প্রশাসনের এক প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা সেলিম রেজা ইয়ারপুর ইউনিয়নের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এছাড়া ঐ ক্ষমতাবানদের মোটা অংকের মাসোহার দিতে হয় বলে জানা গেছে। তাই নির্বিচারে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি করে যাচ্ছেন সেলিম রেজা।
এর আগেও তিনি বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক বনে গেছেন এই কর্মকর্তা।
জানা যায়, বর্তমানে ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদ লুটপাটের জন্য সেলিম রেজা গড়ে তুলেছেন একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মূল হাতিয়ার ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: আফজাল হোসেন ও তাঁর অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন আউট সোর্সিংয়ের আওতায় নিয়োগপ্রপ্ত অ্যাসেট নির্ধারক লস্কর। এই লস্কর বিভিন্ন মিল কারখানার আয়াতন পরিমাপ করেন। তার উপর সরকারী কর বা ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়। এই বর্গফুট পরিমাপে এক একটি প্রতিষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ টাকা হয়। সেখানে সমঝোতার ভিত্তিতে নামমাত্র আয়াতন দেখিয়ে সরকারের মোটা অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নিজের পকেট ভারী করা হয়।
এছাড়া, ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: আফজাল হোসেনকে নাগরিক সনদ, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ সরকারি যেকোনো সেবা নিতে গেলেই সেবাগ্রহিতাকে গুণতে হয় অতিরিক্ত টাকা। সরকারি নির্ধারিত ফির তোয়াক্কা না করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই যেন তার প্রধান পেশা। টাকা না দিলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয় সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের। এ টাকার ভাগ পান প্রশাসক সেলিম রেজা।
অভিযোগ রয়েছে, এই লস্কর এর আগে পাথালিয়া ইউনিয়নে থার্ড পার্টি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে সেই একই কায়দায় ইয়ারপুর ইউনিয়নে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির জাল বিস্তার করেছেন তিনি।
ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল এই দুর্নীতিবাজ প্রশাসক সেলিম রেজা, ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: আফজাল হোসেন ও তাঁর সহযোগী লস্করের কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা সেলিম রেজার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকেও পাওয়া যায়নি।