উন্নত জীবন গড়তে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে ওঠে না। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মানবিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—এই তিন পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যমুক্ত রাখতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হতে হবে সম্পূর্ণ তাদের মেধা ও পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার মানোন্নয়নে আয়োজিত অভিভাবক সমাবেশ ও কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ময়মনসিংহ-৮ ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু এসব কথা বলেন।
এমপি মাজেদ বাবু বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিস্টেমেটিক্যালি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি যতদিন এই স্কুলের সভাপতি থাকব, এখানে কোনো দলীয় রাজনীতির চর্চা দেখতে চাই না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হবে সম্পূর্ণ তাদের প্রফেশনাল স্কিল ও মেধার ওপর।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ঈশ্বরগঞ্জে বিগত বছরগুলোতে কিছু প্রধান শিক্ষকের মূল লক্ষ্য ছিল দপ্তরি ও আয়া নিয়োগ দিয়ে বাণিজ্য করা। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করেছে। কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রভাবের জায়গা হতে দেওয়া যাবে না। দলীয় নেতাদের প্রভাবমুক্ত রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের সভাপতি করার ক্ষেত্রে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ।
শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এমপি মাজেদ বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক একটি সমাজকে বদলে দিতে পারেন। এ প্রসঙ্গে তিনি মতিঝিল আইডিয়াল হাই স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ ফয়জুর রহমানের উদাহরণ তুলে ধরেন।
তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে শতভাগ মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষকতার মূল দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা। শিক্ষার মানোন্নয়নে নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি সম্পর্কে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ছাত্রজীবন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়কে অবহেলা না করে জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই সম্ভাবনা রয়েছে। কঠোর পরিশ্রম, সময়ের সঠিক ব্যবহার ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। তোমরা শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে না, তোমাদের ভালো ফলাফল ও ভালো কাজের মাধ্যমে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ঈশ্বরগঞ্জের সুনাম বৃদ্ধি করবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা শেখার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল—এই চারটি প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না বলে জানান। তাঁর লক্ষ্য আগামী প্রজন্মকে সুন্দর, সুশিক্ষিত ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
এমপি মাজেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। জীবনে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।
তিনি শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত করা, শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
ঈশ্বরগঞ্জ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কামরুল আলমের সভাপতিত্বে এবং ঈশ্বরগঞ্জ গার্লস স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক সেলিম আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, রোকনপুর জুনিয়র হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ড. সুলতানা আফরোজ, সাবেক প্রধান শিক্ষক সুলতানা এম আজিজ, ঈশ্বরগঞ্জ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক সিরাজুল ইসলাম, অভিভাবক সদস্য সাইফুল ইসলাম তালুকদার, তারেক ইবনে মুজিব, রাজিয়া সুলতানা সীমা, জাহিদুল ইসলাম এবং শিক্ষার্থী ফাতিমা জুয়াইরিয়া ও কামরুন্নেছা মার্জিয়া প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত এবং জুনিয়র ট্যালেন্টপুল বৃত্তিপ্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে মেডেল ও ক্রেস্ট তুলে দেন। পরে তিনি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গাছের চারা রোপণ করেন।
আলোচনা সভা শেষে এমপি মাজেদ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে শিক্ষক মিলনায়তনে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী হওয়া এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।