ময়মনসিংহের নান্দাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত প্রভাবিত করতে স্কুল চলাকালীন শতাধিক শিক্ষককে উপজেলা শিক্ষা অফিসে জড়ো করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশে তাঁর অনুসারী ও পছন্দের শিক্ষকরা বিদ্যালয় চলাকালীন অফিসে এসে তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে জড়ো হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নেতারা।
এর আগে অর্থ আত্মসাৎসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
তদন্ত চলাকালে সরেজমিনে উপজেলা শিক্ষা অফিসে গিয়ে দেখা যায়, তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষে শিক্ষক নেতাদের পাশাপাশি উপস্থিত রয়েছেন খোদ অভিযুক্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছা। কক্ষের ভেতরে তখন বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের ভিড় দেখা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তার সামনেই তাঁদের লিখিত অভিযোগের বিষয়ে জবানবন্দি দিতে হচ্ছে। শিক্ষা কর্মকর্তা নিজে উপস্থিত থেকে কে কী বক্তব্য দিচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণ করছেন। এতে সাক্ষীরা স্বাধীনভাবে সত্য কথা বলতে অস্বস্তি ও ভীতির মধ্যে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
তাঁদের ভাষ্য, অনেক শিক্ষক তদন্ত কর্মকর্তার সামনে সাদা কাগজে লিখিত বক্তব্য দিচ্ছেন। আর সেই বক্তব্য দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিই পর্যবেক্ষণ করছেন অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা। ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সকাল থেকেই নান্দাইল উপজেলা শিক্ষা অফিসের ভেতরে ও বাইরে শতাধিক শিক্ষকের উপস্থিতি দেখা যায়। বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অফিস চত্বরে শিক্ষকদের জটলা ও ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
কয়েকজন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাঁদের অফিসে আসতে বলেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে তাঁরা কর্মকর্তার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছেন বলেও জানান।
একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, টিও স্যার আমাদের আসতে বলেছেন, তাই আসতে হয়েছে। স্যারের বিরুদ্ধে যে তদন্ত হচ্ছে, আমরা তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। তিনি খুব ভালো মানুষ। তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।
বিদ্যালয় চলাকালীন শিক্ষকরা অফিসে চলে আসায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে এক প্রধান শিক্ষক বলেন, মাসের শেষ হওয়ায় বেতন তুলতে ব্যাংকে এসেছেন, পাশাপাশি অফিসেও এসেছেন।
তবে সচেতন মহল ও অভিভাবকদের অভিযোগ, চলমান বিদ্যালয় রেখে তদন্তের দিনে দল বেঁধে উপজেলা শিক্ষা অফিসে এসে অভিযুক্ত কর্মকর্তার পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি নীতিবহির্ভূত।
নান্দাইল উপজেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম আনজু বলেন, এভাবে শিক্ষকরা দল বেঁধে আসা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। যতদূর জানতে পেরেছি, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তকে প্রভাবিত ও আড়াল করতেই নিজের পছন্দের শিক্ষকদের ডেকে এনে এই মহড়ার আয়োজন করেছেন।
অন্য এক শিক্ষক নেতা জাকির আহম্মেদ তুহিন বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তা তাঁকে একটু আসার জন্য অনুরোধ করায় তিনি অফিসে এসেছিলেন। তবে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি সেখান থেকে চলে যান।
এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা মজিব আলমের কাছে স্কুল চলাকালীন শিক্ষকদের এমন জমায়েত এবং তদন্ত প্রভাবিতের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব তথ্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখে দ্রুতই অধিদপ্তরে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। তাঁর তদন্তের জন্য মাত্র ১৫টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাকিরা কেন এসেছেন, তা তাঁর জানা নেই।
উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট ২০২৬ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে জারি করা এক অফিস বিজ্ঞপ্তির সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নগর কচুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুন্নাহার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছার বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামত ও সংস্কার খাতে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, উপজেলা শিক্ষা অফিস মেরামত ও আসবাবপত্র সরবরাহের বরাদ্দ থেকে অর্থ লোপাট, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বরাদ্দ থেকে টাকা আত্মসাৎ, উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের সঙ্গে আঁতাত করে অবৈধ বিল উত্তোলন, বদলি নীতিমালা বহির্ভূতভাবে শিক্ষক বদলি, নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের সাময়িক সংযুক্তি প্রদান এবং বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষা কর্মকর্তার কক্ষে এসি স্থাপনসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ।