ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত বিশাল অঙ্কের শুল্ক ফাঁকি দিতে চীন ৪০ টিরও বেশি দেশ নিয়ে ‘ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউসের। তারা বলছে, ভারতসহ ৪০ টিরও বেশি দেশ ও বাণিজ্য অঞ্চল চীনের এই নেটওয়ার্কের মধ্যে রয়েছে। ‘দ্য গ্রেট ট্রান্সশিপমেন্ট স্ক্যাম’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে মার্কিন প্রশাসনের বাণিজ্য ও উৎপাদন নীতি দপ্তর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের এই ছায়া (শ্যাডো) ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় বড় বাণিজ্যিক অংশীদার রয়েছে। মার্কিন ভূখণ্ডের সীমান্তবর্তী মেক্সিকো ও কানাডা থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া পর্যন্ত—চীনের সবচেয়ে বড় সহায়ক দেশগুলোর তালিকা এতটাই বিস্তৃত।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে ভারতের পুনে-গুজরাট-চেন্নাই উৎপাদন বেল্টকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চীন-সংশ্লিষ্ট পাম্প ও কম্প্রেসর আমদানির একটি সম্ভাব্য করিডোর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, এই করিডরের কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটি, ডেটন ও কলম্বাসভিত্তিক শিল্প সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের বাণিজ্য ডেটা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ (অর্থবছর ২৬) সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পাম্প ও কম্প্রেসর রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৫ কোটি ডলার, যা দেশটিতে ভারতের মোট চালানের ১ শতাংশের চেয়েও কম। অথচ, একই অর্থবছরে চীন থেকে ভারতের এসব পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি ডলার।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ দপ্তরের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য গ্রহণ করেছে, যেগুলো মেক্সিকো, ভারত ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন হাবের মাধ্যমে চীন থেকে পুনঃচালান করে পাঠানো হয়েছে বলে তাদের ধারণা। এর ফলে শুল্ক বাবদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কেবল ভারতের মাধ্যমে কত টাকার পণ্য পুনঃচালান করা হয়েছে, তার কোনো আলাদা হিসাব রিপোর্টে দেওয়া হয়নি।
হোয়াইট হাউসের এই প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত ও পদ্ধতি খতিয়ে দেখছে ভারত সরকার। এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘আমরা বিস্তারিতভাবে এই প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত ও পদ্ধতি খতিয়ে দেখতে চাই। কাস্টমস, পণ্যের উৎস সংক্রান্ত নিয়মাবলি (রুলস অব অরিজিন) এবং পণ্য রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের শক্তিশালী আইন ও প্রক্রিয়া রয়েছে। এ ক্ষেত্রে লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রতিবেদনে অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে পণ্য তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে পাঠানো হয় এবং সেখানে সামান্য প্রক্রিয়াকরণ, নতুন লেবেল সংযোজন, পুনঃপ্যাকেজিং, নতুন চালানপত্র তৈরি বা কাগজপত্রে পরিবর্তনের মাধ্যমে পণ্যের প্রকৃত রূপান্তর ছাড়াই একটি নতুন উৎপত্তিস্থলের দেশের ছাপ তৈরি করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ওয়াশিংটনের আরোপিত শুল্কের জবাবে চীন যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি রপ্তানি কমিয়ে একটি বৈশ্বিক ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাকে উৎসাহিত করেছে।
হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে চিহ্নিত ৪০ টিরও বেশি অর্থনীতিকে ‘চীনের শ্যাডো ট্রান্সশিপমেন্ট নেটওয়ার্ক’-এর আওতায় তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে, আর ভারতকে রাখা হয়েছে প্রথম স্তরে (টায়ার ১)—যেখানে কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইসরায়েল, জাপান, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানও রয়েছে।
প্রতিবেদনে প্রথম স্তরের অর্থনীতিগুলোকে ‘বহুমুখী মাত্রার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যারা বিশাল পরিমাণের চীন-সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎস হওয়া সত্ত্বেও তাদের নিজস্ব বৈচিত্র্যময় শিল্প ভিত্তি এবং মার্কিনমুখী প্রধান রপ্তানি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। এসব স্থানে ট্রান্সশিপমেন্টের ঝুঁকি বৈধ ও ব্যাপক বাণিজ্য প্রবাহের ভেতরেই গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের এই প্রতিবেদনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সন্দিহান ভারতের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা। নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) মতে, প্রতিবেদনটি ট্রান্সশিপমেন্টের প্রযুক্তিগত সংজ্ঞাকে অতিরিক্ত প্রসারিত করেছে। জিটিআরআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ‘এর ফলে উৎপত্তিস্থল সংক্রান্ত জালিয়াতির সঙ্গে বৈধ উৎপাদন প্রক্রিয়াকে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে। কোনো লঙ্ঘন প্রমাণিত হওয়ার আগেই এতে বৈধ প্রক্রিয়াকরণ ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলভিত্তিক উৎপাদনকে ট্রান্সশিপমেন্ট হিসেবে উপস্থাপনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’
অনিয়মিত রুট বা পথ শনাক্ত করা, উৎপাদন ক্ষমতা মূল্যায়ন করা এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ চালানের দিকে কাস্টমস এনফোর্সমেন্টকে নির্দেশ করার জন্য রিপোর্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ‘ডিটেকটিভ বর্ডার’ ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অজয় শ্রীবাস্তব সতর্ক করে বলেন, “প্রস্তাবিত এআই-চালিত ‘ডিটেকটিভ বর্ডার’ ব্যবহারের ফলে পণ্য পরিদর্শন বৃদ্ধি, চালানে বিলম্ব, বকেয়া শুল্ক এবং জরিমানা আরোপের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। ”
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের জন্য স্পর্শকাতর একটি সময়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো। এর মাত্র এক সপ্তাহ আগেই মার্কিন সিনেট এমন একটি বিল পাস করেছে, যার ফলে রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ হতে পারে। এ ছাড়া, মার্কিন ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ কার্যালয়ের পক্ষ থেকে মার্কিন ট্রেড আইনের ৩০১ ধারায় ভারতের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা থাকার অভিযোগে একটি তদন্তও চলমান রয়েছে।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফরেন ট্রেডের প্রধান ও অধ্যাপক রাম সিং বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ‘একের পর এক স্তরে’ অনিশ্চয়তা যোগ করে চলেছে। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এসব প্রতিবেদন ও ঘোষণা মূলত ভারত ও অন্যান্য অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দরকষাকষিতে একটি সুবিধাজনক অবস্থান তৈরির চেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।’
তবে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, ইতিমধ্যে শুল্কজনিত বাধা থাকার পাশাপাশি এই প্রতিবেদনের কারণে অশুল্ক বাধাও তৈরি হতে পারে। বর্তমানে ১৯৭৪ সালের মার্কিন ট্রেড আইনের ৩০১ ধারার আওতায় ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে, আর ওয়াশিংটন শুল্ক আরও বাড়ানোর একাধিক পথও খোলা রেখেছে।