গত কয়েক বছরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বড় ধরনের রাজনৈতিক রদবদল, গণঅভ্যুত্থান এবং সরকার পতনের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; বরং তা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
১. বাংলাদেশ সহ এশিয়ার সরকার পতন: পরাশক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গি
ক) যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি (মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও ভূ-কৌশল)
গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সুশাসন:যুক্তরাষ্ট্র সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে পরিবর্তনগুলোকে ইতিবাচক চোখে দেখে। বাংলাদেশে ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার প্রতি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করেছে।
চীনকে ঘিরে কৌশল (Containment): ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (IPS)-এর মূল লক্ষ্য হলো এশিয়ায় চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকানো। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনগুলোকে তারা চীনপন্থী শক্তিকে কোণঠাসা করার এবং নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করার সুযোগ হিসেবে দেখে।
সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব:নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি এবং বাণিজ্য শর্ত শিথিল বা জোরদার করার মাধ্যমে ওয়াশিংটন আঞ্চলিক দেশগুলোকে মার্কিন বলয়ে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
খ) চীনের দৃষ্টিভঙ্গি (স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও হস্তক্ষেপহীনতা)
'অহস্তক্ষেপ নীতি' ও স্থিতিশীলতা:চীন সাধারণত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার (Non-interference) নীতি অনুসরণ করে। যেকোনো দেশে সরকার পতন হলে বেইজিংয়ের প্রাথমিক উদ্বেগ থাকে তাদের কোটি কোটি ডলারের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ (যেমন: বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা BRI) সুরক্ষিত আছে কি না।
সকল রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক: চীনের রাজনৈতিক কৌশল বেশ বাস্তবমুখী। তারা ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্রুত অভিযোজিত হয়। বাংলাদেশে যেমন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চীন দ্রুত নতুন প্রশাসন এবং অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করেছে, যাতে তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প বা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বাধাগ্রস্ত না হয়।
আমেরিকান প্রভাব ঠেকানো: চীনের সবচেয়ে বড় ভয় হলো কোনো দেশে সরকার পতনের পর সেখানে যদি একটি পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে বঙ্গোপসাগর বা ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের জন্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২. ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্ল্যান ও ভূ-রাজনৈতিক ছক
এশিয়ায় মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্ল্যান ৷৷ ৷৷৷৷৷ চীনের প্ল্যান
• ইন্দো-প্যাসিফিক জোট • বেল্ট অ্যান্ড রোড
• নিরাপত্তা ও বাণিজ্য • বাণিজ্য ও ঋণ সহায়তা • প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন • সামরিক আধুনিকায়ন
সূচক -যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ও চীনের কৌশল
মূল লক্ষ্য ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনকে ঘেরাও করা এবং মুক্ত নৌ-চলাচল নিশ্চিত রাখা। অর্থনীতি ও অবকাঠামোর মাধ্যমে বিকল্প বৈশ্বিক কেন্দ্র তৈরি করা।
রাজনৈতিক হাতিয়ার গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সিভিল সোসাইটিকে সহায়তা ও সংস্কারমূলক ঋণ। কূটনৈতিক নিরপেক্ষতা, বড় বাজেটের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
সামরিক দিক QUAD, AUKUS এবং দ্বি-পাক্ষিক সামরিক মহড়া বা সরঞ্জাম সরবরাহ বাড়ানো। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের বন্দরগুলোতে উপস্থিতি শক্তিশালী করা।
৩. কৌশলগত ফলাফল ও আঞ্চলিক প্রভাব
ভারসাম্য রক্ষা করা (Hedging): বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মূল ভবিষ্যৎ কৌশল হবে কোনো একক পরাশক্তির দিকে ঝুঁকে না পড়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা।
ভারতের অবস্থান: এশিয়ায় মার্কিন-চীন খেলায় ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ঠেকানোর জন্য ভারতকে সাথে রাখতে চায়, কিন্তু বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অনেক সময় ভারতের নিজস্ব আঞ্চলিক প্রভাবের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক সুযোগ ও ঝুঁকি: দু'পক্ষের প্রতিযোগিতার ফলে এশিয়ার দেশগুলো উন্নয়ন সহায়তা, ঋণ শিথিলতা বা বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করতে পারে। তবে দুই শক্তির সামরিক বা রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাঝে পিষে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিও রয়েছে।
রূপরেখা
বাংলাদেশ সহ এশিয়ার সামগ্রিক রাজনীতিতে আগামী দিনগুলোতে ক্ষমতার ভারসাম্য আরও জটিল হবে। আমেরিকা চাইবে তাদের মিত্রদের নিয়ে এ অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক ঘাঁটি শক্ত রাখতে।
অন্যদিকে, চীন তাদের অর্থনৈতিক শক্তি, দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং যেকোনো সরকারের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চাইবে।
এ অঞ্চলের নতুন সরকারগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে এই দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব থেকে সর্বাধিক সুবিধা বের করে আনা।