ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু সাহাবির নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে, যাদের জীবন শুধু ইবাদত, জ্ঞান ও ত্যাগের জন্য নয়; বরং দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা এবং উম্মাহর সংকটময় সময়ে সঠিক দিকনির্দেশনার জন্যও অনন্য হয়ে আছে। তাদেরই অন্যতম হলেন হজরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.)—যিনি ছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সাহাবি, তার গোপনীয়তার বিশ্বস্ত রক্ষক এবং ফেতনা ও ভবিষ্যৎ সংকট সম্পর্কিত জ্ঞানে সাহাবিদের মধ্যে সর্বাধিক পারদর্শী ব্যক্তিত্ব।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দীর্ঘ সাহচর্যে তিনি অর্জন করেছিলেন দ্বীনের গভীর জ্ঞান, ফিকহের সূক্ষ্ম উপলব্ধি, কুরআনের ব্যাখ্যা, আত্মশুদ্ধির শিক্ষা এবং মানুষের অন্তর্জগত বোঝার অসাধারণ প্রজ্ঞা। একজন ফকিহ, মুফাসসির, বীর মুজাহিদ, সুফি ও প্রাজ্ঞ শিক্ষক হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে তার অবদান আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে।
বংশ পরিচয় ও প্রাথমিক জীবন
তার নাম হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.)। তার পিতার প্রকৃত নাম ছিল জাবের ইবনুল হারিস আল-আবসি। তবে তিনি আল-ইয়ামান নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তার কুনিয়াত ছিল আবু আবদুল্লাহ। তার মা ছিলেন আল-রাবাব বিনতে কাব, যিনি মদিনার আনসারদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
হজরত হুজাইফা (রা.)-এর জন্মের সময়ই মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বনু আবস গোত্রের যে দশজন প্রতিনিধি প্রথমদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তার পিতা তাদের অন্যতম ছিলেন। তার মা-ও ইসলামের প্রাথমিক যুগেই ইমান গ্রহণ করেন। ফলে ইমান, তাকওয়া ও দ্বীনি শিক্ষায় পরিপূর্ণ এক পরিবেশেই তার শৈশব অতিবাহিত হয়।
অল্প বয়সেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে হিজরত করে মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হলে নবীজি তাকে মুহাজির কিংবা আনসারের যেকোনো একটি পরিচয় গ্রহণের সুযোগ দেন। তিনি আনসারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি আনসারদেরই একজন।’
পরবর্তীতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রতিষ্ঠার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)-এর সঙ্গে তার ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দেন।
নবীজির সান্নিধ্যে জ্ঞান অর্জন ও আত্মশুদ্ধি
হজরত হুজাইফা (রা.) দীর্ঘ সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্যে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি নবীজির পরিচালিত জ্ঞান, হেকমত ও আত্মশুদ্ধির অনন্য শিক্ষালয় থেকে গভীর দ্বীনি জ্ঞান লাভ করেন।
নিজের আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। একবার নিজের কথাবার্তায় কিছুটা কঠোরতা অনুভব করে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এর প্রতিকার জানতে চান। নবীজি তাকে অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করার পরামর্শ দেন। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করতেন।
তার বর্ণিত হাদিসে ইসলামি আকিদা, নামাজ, রোজা, জাকাত, কিয়ামতের আলামত, আখলাক, আধ্যাত্মিকতা, জিহাদ এবং সমাজব্যবস্থাসহ ইসলামি জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পেয়েছে।
আরও পড়ুনআরও পড়ুনসন্তানের আকিকা সপ্তম দিনে না হলে কি আর করা যাবে না?
হাদিস বর্ণনা ও ইসলাম প্রচারে অনন্য ভূমিকা
ইসলামের বিজয়যাত্রায় হজরত হুজাইফা (রা.) ইরাক ও পারস্য বিজয় অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একজন সাহসী সৈনিক ও দক্ষ সেনাপতি হওয়ার পাশাপাশি তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। অপ্রয়োজনীয়ভাবে অধিক হাদিস বর্ণনা করতেন না। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রচারের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল।
বিশেষ করে ফেতনা, সামাজিক বিপর্যয় এবং ভবিষ্যতের সংকটসংক্রান্ত হাদিসের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানসম্পন্ন। তিনি নিজেই বলতেন—
كَانَ النَّاسُ يَسْأَلُونَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَنِ الْخَيْرِ، وَكُنْتُ أَسْأَلُهُ عَنِ الشَّرِّ، مَخَافَةَ أَنْ يُدْرِكَنِي
‘লোকেরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন; আর আমি তাকে অকল্যাণ ও ফেতনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম, যাতে আমি তা থেকে বেঁচে থাকতে পারি।’ (বুখারি ৩৬০৬, (মুসলিম ১৮৪৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যতে উম্মাহর সামনে যেসব ফেতনা ও সংকট আসবে, সেগুলোর অনেক বর্ণনা তিনি হজরত হুজাইফা (রা.)-কে শুনিয়েছিলেন। ফলে সাহাবি ও তাবেয়িরা জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে তার কাছ থেকেই দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতেন।
ফিকহ, গবেষণা ও কুরআনের সেবায় অবদান
দীর্ঘদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে থাকার কারণে হজরত হুজাইফা (রা.) শরিয়তের উদ্দেশ্য, বিধান এবং হিকমত গভীরভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ফতোয়া দেওয়ার সময় কঠোরভাবে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করতেন। ব্যক্তিগত মতামতের পরিবর্তে ওহির আলোতেই তিনি সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন। তিনি কুরআনুল কারিমের লেখক (কাতিবুল ওহি) সাহাবিদের অন্যতম হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
তাকওয়া, দুনিয়াবিমুখতা ও সৎকাজের আহ্বান
দুনিয়ার মোহ, সম্পদ কিংবা বিলাসিতা কখনোই তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। একদিন ঘরে খাবার না থাকলেও তিনি আনন্দ প্রকাশ করে বলতেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি—
إِنَّ اللَّهَ يَحْمِي عَبْدَهُ الْمُؤْمِنَ مِنَ الدُّنْيَا كَمَا يَحْمِي أَحَدُكُمْ مَرِيضَهُ مِنَ الطَّعَامِ
‘আল্লাহ তার মুমিন বান্দাকে দুনিয়ার (অতিরিক্ত ভোগবিলাস) থেকে এভাবে রক্ষা করেন, যেমন তোমাদের কেউ তার অসুস্থ স্বজনকে ক্ষতিকর খাবার থেকে রক্ষা করে।’ (মুসনাদ আহমাদ ২৩৬৩৮, ইবনে হিব্বান ৬৬৯)
তিনি সর্বদা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। প্রায়ই তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ হাদিসটি স্মরণ করিয়ে দিতেন—
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ، وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ، أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ، ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلَا يُسْتَجَابُ لَكُمْ
‘যার হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ! তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। অন্যথায় আল্লাহ শিগগিরই তোমাদের ওপর তার পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন। তখন তোমরা দোয়া করবে, কিন্তু তা কবুল করা হবে না।’ (তিরমিজি ২১৬৯)
ওফাত
হজরত ওসমান ইবন আফফান (রা.)-এর শাহাদাতের কিছুদিন পর ইরাকের ঐতিহাসিক মাদায়েন নগরে ইন্তেকাল করেন হজরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.)। বর্তমানে ইরাকের মাদায়েনে সালমান আল-ফারসি (রা.)-এর মসজিদের পাশেই তার কবর অবস্থিত, যা মুসলিম ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পরিচিত।
হজরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়— একজন প্রকৃত আলেম কেবল জ্ঞানের অধিকারী নন; তিনি আত্মশুদ্ধিতে সচেতন, সত্য প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়, সমাজের সংকট সম্পর্কে সজাগ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি কল্যাণ জানতেন, আবার অকল্যাণও চিনতেন— যাতে নিজে বাঁচতে পারেন এবং উম্মাহকেও সতর্ক করতে পারেন।
আজ যখন মুসলিম সমাজ নানামুখী ফেতনা, বিভ্রান্তি ও মূল্যবোধের সংকটের মুখোমুখি, তখন হজরত হুজাইফা (রা.)-এর প্রজ্ঞা, তাকওয়া, সতর্কতা এবং কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জীবনদর্শন আমাদের জন্য এক অনন্য দিশারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের তার মতো সত্যনিষ্ঠ, দূরদর্শী ও তাকওয়াবান হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।