কখনো ভারী বর্ষণ, কখনোবা সারা দিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। কখনো আবার দিনের পর দিন সূর্যের দেখা নেই। কিছুদিন ধরে তো আবহাওয়া এমনই। শ্রাবণ মাস চলছে। কখন বৃষ্টি নামে বলা যায় না, এ কথা ভেবেই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে আমরা সকালে বাড়ি থেকে বের হই। আবার এখন ডেঙ্গুর সময়, তাই মশার উপদ্রব এড়াতেও ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর ফলে ঘরে একটা গুমোট ভাব দেখা দিচ্ছে। দিন শেষে বাড়ি ফিরে ঘরের বাতাসও যেন বিশুদ্ধ মনে হয় না। পাশাপাশি এই ঋতুতে ঘরের বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যায়, ধুলোপোকা জন্মায় ও ছত্রাক দ্রুত বেড়ে ওঠে। এতে ঘরের তরতাজা ভাব আর থাকে না। ফলে ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ রাখার চেষ্টা করতে হয়।
বর্ষাকালে ঘরের ভেতরে বাতাস বিশুদ্ধ না থাকলে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা, অ্যালার্জি, নাক বন্ধ ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং হাঁপানি বা অ্যালার্জিতে ভোগা মানুষের জন্য এ সময় ঘরের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাই বর্ষার এই সময়ে কিছু বাড়তি যত্ন নিলে ঘরের বাতাস পরিচ্ছন্ন, আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যকর রাখা সম্ভব।
বর্ষাকালে আর্দ্র পরিবেশে বিছানার নিচে ধুলাবালুর সঙ্গে ধুলোপোকা ও ছত্রাক দ্রুত বেড়ে ওঠে। সপ্তাহে অন্তত একবার খাটের নিচে ও কোনায় ভালো করে ঝাড়ু দিয়ে ময়লা বের করতে হবে। এরপর অ্যান্টিসেপ্টিক মেশানো পানি দিয়ে ভালোভাবে মুছে নিতে হবে। খাটের নিচে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জমিয়ে না রেখে স্টোরেজ বক্স ব্যবহার করলে নিয়মিত এই জায়গা পরিষ্কার করা আরও সহজ হবে।
আর্দ্র আবহাওয়ায় ম্যাট্রেস ও বালিশে সহজেই জীবাণু ও ছত্রাকের বিস্তার ঘটে। তাই ম্যাট্রেস প্রোটেক্টর, বেডশিট ও বালিশের কভার নিয়মিত বদলে বদলে ব্যবহার করলে ধুলোপোকা ও আর্দ্রতার প্রভাব অনেকটাই কমে। ভেজা চুল নিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে, তা এ সময় এড়িয়ে চলাই ভালো।
বর্ষাকালে কাপড় শুকাতে সময় বেশি লাগলেও বিছানার চাদর, বালিশের কভার ও সোফার কভার নিয়মিত ধোয়া জরুরি। সম্ভব হলে গরম পানিতে ধুয়ে পুরোপুরি শুকিয়ে ব্যবহার করুন। কারণ সামান্য স্যাঁতসেঁতে ভাবও ছত্রাক জন্মানোর জন্য যথেষ্ট।
বেশি বৃষ্টিতে ভারী পাপোশ, কার্পেট ও পর্দা সহজে ভিজে, স্যাঁতসেঁতে হয়ে যেতে পারে। তাই এগুলোকে যত্ন করে তুলে রাখুন। যাতে ফাঙ্গাস না ধরে সে জন্য পলিথিনে মুড়িয়ে রাখতে পারেন। এ সময়টা পাতলা পর্দা, পাপোশ, বেডশিট ইত্যাদি ব্যবহার করুন। এগুলো ধোয়া ও শুকানো দুটোই সহজ। দরজার জন্য একাধিক পাপোশ রাখুন, যাতে একটি ভিজে গেলে তার বদলে অন্যটি ব্যবহার করতে পারেন। ভেজা পাপোশ থেকেও অনেক সময় ঘরে দুর্গন্ধ ছড়ায়।
বর্ষাকালে অনেকের বাসার কাঠের আসবাবে ছত্রাকের সংক্রমণ দেখা দেয়। এ জন্য কাঠে পচন দেখা দেয়। অনেক সময় আবার আর্দ্রতা শোষণ করে কাঠগুলো ফুলে ওঠে। এ সময় কাঠের আসবাব দেয়াল থেকে ছয় ইঞ্চি দূরে রাখার চেষ্টা করুন। এই আবহাওয়ায় অনেক সময় আসবাবে ঘুণ ধরতে দেখা যায়। নিমপাতা, নিমের তেল, কর্পূর ও স্পিরিট একসঙ্গে মিশিয়ে একটা স্প্রে বানিয়ে বোতলে ভরে রাখুন। আসবাবে ঘুণ ধরলেই স্প্রে করে দিন।
বর্ষাকালে পোকামাকড় ও মাছি তাড়ানোর জন্য খাবার তৈরির পর রান্নাঘরের কাউন্টার, চিমনি ও খাবারের টেবিল লবণ ও ভিনেগার মেশানো পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন। এ সময় বাড়িতে সতেজ বাতাস ঢুকতে দেওয়া জরুরি। সব সময় দরজা-জানালা আটকে না রেখে বাড়ি ফিরে কিছু সময়ের জন্য হলেও খুলে রাখুন, যাতে তাজা বাতাস সঞ্চালিত হয় এবং আপনার ঘর থেকে দুর্গন্ধ দূর হয়। এই ঋতুতে নিয়মিত জীবাণুনাশক দিয়ে স্নানঘর পরিষ্কার করুন। বৃষ্টির দিনে একটু পুরোনো স্নানঘরে একধরনের স্যাঁতসেঁতে বাজে গন্ধ হয়। এই গন্ধ এড়াতে সুগন্ধি এয়ার স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন। সম্ভব হলে, শুষ্ক রাখতে এগজস্ট ফ্যান ব্যবহার করুন। ট্যাপ ও ঝরনা ব্যবহারের পর শুকনা কাপড় দিয়ে মুছে রাখুন। বর্ষাকালে এসব জায়গায় জীবাণু জন্মায়। স্নানঘর সপ্তাহে একবার বেকিং পাউডার ও ভিনেগার দিয়ে পরিষ্কার করুন, যাতে জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া তৈরি না হয়।
স্যাঁতসেঁতে ভাব এবং শেওলা থাকলে মাছি ও পোকামাকড় বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে। রান্নাঘরের প্ল্যাটফর্ম, টেবিল, আলমারি, দেয়াল, মেঝে ইত্যাদি জায়গা ঘন ঘন জীবাণুমুক্ত করা উচিত। বাজারে নানান জীবাণুনাশক স্প্রে পাওয়া গেলেও বাড়িতে এটি সহজে বানিয়ে ফেলা যায়। ২৫ শতাংশ ভিনেগারে ৭৫ শতাংশ পানি মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করে নিন। এরপর সুগন্ধের জন্য এসেনশিয়াল অয়েল মেশান। এই প্রাকৃতিক ডিসইনফেকট্যান্ট স্প্রে দিয়ে নিজের বাড়ির নানান অংশ জীবাণুমুক্ত করুন।
সুগন্ধি মোম ঘরের দুর্গন্ধ দূর করতে সহায়তা করে। বৃষ্টির দিনে ঘরে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে সুগন্ধি মোমবাতি জ্বালাতে পারেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এটি ব্যবহার করলে বাতাসে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান জমতে পারে। তাই সীমিত সময় ব্যবহার করুন এবং পরে ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
সূত্র: মাইন্ড বডি গ্রিন এবং অন্যান্য