এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষকবহির্ভূত কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা আবারও গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত প্রকাশের পরপরই চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের একাংশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে অভিযোগ করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে অতীতে যেসব অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ ছিল, সেগুলো আরও উৎসাহিত হবে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এ-সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করে। এতে ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জারি করা শিক্ষক ব্যতীত অন্যান্য এমপিও পদে নিয়োগ সংক্রান্ত পরিপত্র বাতিল করে সংশোধিত নির্দেশনা কার্যকর করা হয়।
পরিপত্র প্রকাশের পর থেকেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য চাকরিপ্রার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এমন বাস্তবতায় নিয়োগের ক্ষমতা আবারও পরিচালনা কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তারা হতাশাজনক বলে মনে করছেন।
চাকরিপ্রার্থী মো. আরিফ হোসেন বলেন, "এই সিদ্ধান্তে আমরা ভীষণ হতাশ। আমরা ভেবেছিলাম সরকার অন্তত কর্মচারী নিয়োগেও এমন একটি ব্যবস্থা করবে যেখানে যোগ্যতার মূল্য থাকবে। কিন্তু এখন আবার সেই পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হলো। অতীতে একটি অফিস সহায়ক বা অফিস সহকারী পদে নিয়োগ পেতে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ আমরা শুনেছি, পত্রিকায় পড়েছি। দরিদ্র ও মেধাবী একজন চাকরিপ্রার্থী কখনোই এই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। যার টাকা আছে, যার রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব আছে, সে এগিয়ে যায়। এই সিদ্ধান্ত যদি কার্যকর হয়, তাহলে প্রকৃত মেধাবীরা আরও বঞ্চিত হবে। আমরা চাই সরকার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করুক, লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভার মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করুক।"
শিক্ষা বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম বলেন, "বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে বহু বছর ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিনের। তাই নিয়োগের ক্ষমতা স্থানীয়ভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি যদি কঠোর নজরদারি, ডিজিটাল আবেদন, কেন্দ্রীয় লিখিত পরীক্ষা এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ না থাকে, তাহলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। সরকারের উচিত এমন একটি ব্যবস্থা করা, যাতে কোনো যোগ্য প্রার্থী অর্থ বা প্রভাবের কারণে বঞ্চিত না হন এবং কোনো প্রতিষ্ঠানও অনিয়ম করার সুযোগ না পায়।"
যদিও সরকারের পরিপত্রে নিয়োগ কার্যক্রম বিদ্যমান বিধি-বিধান অনুসারে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে, তবুও নতুন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন শিক্ষা অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। চাকরিপ্রার্থীদের একাংশের দাবি, সরকার যেন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।