ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ও পার্লামেন্ট সংলগ্ন এলাকা সোমবার দিনভর কার্যত সংঘর্ষের নগরীতে পরিণত হয়। ফেইসবুকভিত্তিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর ডাকা ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দিল্লি পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে অন্তত ১১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দিল্লি পুলিশ। একই ঘটনায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দিল্লি পুলিশের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, আন্দোলনকারীদের একটি অংশ পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল ও পাথর নিক্ষেপ করে, ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা চালায় এবং সরকারি যানবাহন ও অন্যান্য সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি করে। এসব ঘটনায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।
ভারতের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (নিট)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জুন থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছে ফেইসবুকভিত্তিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সোমবার 'সংসদ চলো' কর্মসূচির ঘোষণা দেয় সংগঠনটি। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো সমর্থক যন্তর মন্তর এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। পরে সেখান থেকে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে পদযাত্রা শুরু করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পদযাত্রা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের আটকে দেয়। প্রথমে মাইকিং করে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করে এবং ব্যারিকেড দিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে।
পুলিশি বাধার মুখে বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও কিছু সময় পর আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসে জড়ো হন। তারা পুনরায় কর্মসূচি শুরু করার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়।
চোখের পলকে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ও পাথর ছুড়ে মারতে থাকে। জবাবে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ করে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে।
দিল্লি পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী,
"বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপর বারবার ইট-পাটকেল ও পাথর নিক্ষেপ করেছে। তারা নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ অভিমুখে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ ছাড়া সরকারি যানবাহন ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করেছে, যা রাজধানীর নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে।"
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, আহত ১১৮ জনের মধ্যে শুধু কনস্টেবল বা সাধারণ সদস্য নন, রয়েছেন পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন—
স্পেশাল কমিশনার অব পুলিশ
জয়েন্ট কমিশনার অব পুলিশ
অতিরিক্ত কমিশনার অব পুলিশ
ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ
অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার
সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি)
একাধিক নারী পুলিশ সদস্য
অনেকের মাথা, হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছে বলে জানানো হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ স্বীকার করেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের লাঠিচার্জে অন্তত ৬০ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন।
আহতদের কয়েকজনকে ঘটনাস্থলেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর আহতদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে তাদের বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সংঘর্ষের পর অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকেই অন্তত ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে দিল্লি পুলিশ।
তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা প্রদান, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, দাঙ্গা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোসহ একাধিক ধারায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ ও সিসিটিভি ক্যামেরার রেকর্ড বিশ্লেষণ করে আরও কয়েকজনকে শনাক্তের কাজ চলছে।
সংঘর্ষের পর যন্তর মন্তর, পার্লামেন্ট ভবন, নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লক ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে আন্দোলনকারীরা তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর রয়েছে ভারতের রাজনৈতিক মহলসহ সাধারণ মানুষের।