ডেঙ্গু আক্রান্তদের অধিকাংশই সঠিক পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। সাধারণভাবে প্রায় ৮৫ শতাংশ রোগীর ডেঙ্গুর উপসর্গ মৃদু থাকে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে বাসাতেই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা নিরাপদ। তবে অ্যাসপিরিন বা এ ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডেঙ্গু শনাক্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রামের পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত তিন লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। ডাবের পানি, ফলের রস, স্যুপসহ অন্যান্য তরল খাবার শরীরের পানিশূন্যতা রোধে সহায়ক। পাশাপাশি মাছ, ডিম, মুরগির মাংস ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ রোগীর দ্রুত সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।
এডিস মশা অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও ডিম পাড়তে পারে। এমনকি পানি শুকিয়ে গেলেও ডিম দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে সক্ষম। তাই শুধু পানি ফেলে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না; পানির পাত্রের ভেতরের দেয়ালও ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজন হলে ব্লিচিং পাউডার, ডিটারজেন্ট বা অনুমোদিত লার্ভিসাইড ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণাধীন ভবনগুলোর জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা গেলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ির ভেতর ও চারপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না তা পরীক্ষা করা উচিত। ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, বোতল, ভাঙা পাত্র কিংবা অন্যান্য জলাধারে পানি জমে থাকলে তা ফেলে দিতে হবে। যেসব পাত্রে সবসময় পানি রাখতে হয়, সেগুলো সপ্তাহে অন্তত একবার ব্লিচিং পাউডার বা ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে পুনরায় ব্যবহার করা উচিত।
অব্যবহৃত গাড়ির টায়ার খোলা জায়গায় ফেলে রাখা যাবে না, কারণ সেখানে সহজেই পানি জমে এডিস মশার প্রজনন হয়। একইভাবে দই বা অন্যান্য খাবারের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পাত্রও বাইরে জমিয়ে রাখা উচিত নয়।
নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত, ইট ভেজানোর চৌবাচ্চা, ড্রাম বা অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। সেখানে লার্ভা দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ভবনের মালিকদের এসব স্থান পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত লার্ভিসাইড বা অন্য কার্যকর উপকরণ ব্যবহার করা উচিত। আশপাশে এমন ভবন থাকলে স্থানীয়ভাবে সচেতনতা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাড়ির আশপাশে সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্থাপনায় যদি পানি জমে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। এছাড়া গাছের কোটর, কাটা বাঁশের গোড়া বা যেসব স্থানে সহজে পানি জমে, সেগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া ভালো।
বাজারে প্রচলিত অনেক মশার কয়েল, ধূপ বা তরল রিপেলেন্টের ধোঁয়া দীর্ঘসময় শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই নিরাপদ বিকল্প হিসেবে কিছু প্রাকৃতিক উপায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
রসুন বাটা, সামান্য তেজপাতার গুঁড়া, কর্পূর ও সরিষার তেল মিশিয়ে একটি মাটির প্রদীপে সলতে জ্বালিয়ে ব্যবহার করলে এর গন্ধ মশা দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
এ ছাড়া একটি লেবু চার টুকরো করে কেটে তার ভেতরে কয়েকটি লবঙ্গ গুঁজে ঘরের বিভিন্ন কোণে রাখলেও মশা কম আসতে পারে। কর্পূরের ট্যাবলেট পানিভর্তি একটি ছোট পাত্রে রেখে দিলে ধীরে ধীরে এর গন্ধ ছড়িয়ে মশা দূরে রাখতে সহায়তা করে।
শুধু ধোঁয়া দিয়ে উড়ন্ত মশা মারা যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার লার্ভা ধ্বংস করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাবান: বাসন মাজার সাবান বা সাধারণ তরল সাবান পানির সঙ্গে মিশিয়ে লার্ভাযুক্ত স্থির পানিতে ব্যবহার করলে লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর হতে পারে।
ব্লিচিং পাউডার: অন্য কোনো উপায় না থাকলে বদ্ধ জমে থাকা পানিতে নির্ধারিত পরিমাণ ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি যেন খোলা জলাশয় বা প্রবাহমান পানিতে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তেল: অলিভ অয়েল, ভেজিটেবল অয়েল বা কেরোসিনের পাতলা স্তর জমে থাকা পানির ওপর দিলে লার্ভা বাঁচতে পারে না। তবে মাছ বা অন্যান্য জলজ প্রাণী আছে এমন পানিতে এসব ব্যবহার করা উচিত নয়।
অ্যাপেল সিডার ভিনেগার: নির্দিষ্ট অনুপাতে পানির সঙ্গে অ্যাপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে স্থির পানিতে ব্যবহার করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লার্ভা ধ্বংস হতে পারে। এটি তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা। ব্যক্তি, পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগই ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে।